চীনে সংখ্যালঘুদের জন্য নতুন আইন

বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন 'চীনা জাতীয় পরিচয়' ও ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে গড়ে তোলার নীতি অনুসরণ করে আসছে চীনা সরকার।  নতুন একটি বিস্তৃত আইনের মাধ্যমে এবার সেই নীতিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে, যা শুধু চীনের ভেতরেই নয়, দেশের বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের সুযোগ রাখছে। সূত্র সিএনএন। 

'এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রগ্রেস প্রমোশন ল' নামে পরিচিত এই আইন বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে চীনের স্বীকৃত ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতিগত ঐক্য নষ্ট করে বা বিভেদ সৃষ্টি করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চীনের প্রায় একশো চল্লিশ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি হান চীনা জাতিগোষ্ঠীর। 

নতুন আইনের আওতায় স্কুল, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থায় মান্দারিন ভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানোর হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে  অভিন্ন সম্প্রদায়ের চেতনা গড়ে ওঠে। এছাড়া অভিভাবকদের সন্তানদের কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনা জনগণকে ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়ার কথাও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

আইন অনুযায়ী, জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে চীনের ইতিহাস ও জাতীয় উন্নয়ন তুলে ধরে বিভিন্ন আয়োজন করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে আবাসন নীতিতেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আরও বেশি সমন্বয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিধান ভবিষ্যতে কিছু এলাকায় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের পথও তৈরি করতে পারে।

আইনটির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি 'জাতিগত ঐক্য বিনষ্ট' বা 'বিভেদ সৃষ্টি' করে বলে বেইজিং মনে করে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমালোচকদের মতে, এই বিধান বিদেশে বসবাসরত কর্মী, গবেষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে আইনটি নিয়ে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এই আইন জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

গত এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, এই আইন তিব্বতি, উইঘুর ও মঙ্গোল জনগোষ্ঠীর ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইনের কিছু বিধান বিদেশেও প্রয়োগের চেষ্টা হতে পারে, যা আন্তঃসীমান্ত দমন-পীড়নের ঝুঁকি তৈরি করবে।

চীনবিষয়ক গবেষক এবং অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস লাইবোল্ডের মতে, বেইজিং এখন আর 'জাতিগত ঐক্য'কে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখছে না। বরং শিক্ষা, পরিবার, গণমাধ্যম, জাদুঘর, সরকারি প্রশাসন, বাজেট, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে একক চীনা জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলাকে রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্বে পরিণত করেছে।

তার ভাষায়, এই আইনের মূল বার্তা হলো  সংখ্যালঘুদের নিজস্ব পরিচয় তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা কমিউনিস্ট পার্টি নির্ধারিত চীনা জাতীয় পরিচয়ের অধীন থাকবে।

লাইবোল্ড আরও বলেন, নতুন আইন বিদেশে থাকা গবেষক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং প্রবাসী চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মসেন্সরশিপের প্রবণতা বাড়াতে পারে। এতে গবেষণা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং চীনের জাতিগত নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।