মাঠের বাইরে ব্রাজিলের ফুটবলাররা সাধারণত রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। নেইমার ছাড়া বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তির দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ইনস্টাগ্রাম) চোখ রাখলে দেখা যায়, দলের ভেতর যেমন ডানপন্থার সমর্থক আছেন, তেমনি আছেন বামপন্থী বা প্রগতিশীল চিন্তাধারার অনুসারীও।
অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাউকে ফলো বা অনুসরণ করার মানেই এই নয় যে, ওই খেলোয়াড় সরাসরি সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলকে সমর্থন করছেন।
ব্রাজিলে দৈনিক ও গ্লোবো এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাতীয় দলে বামপন্থী রাজনীতির প্রকাশ্য কোনো সমর্থক না থাকলেও, ডিফেন্ডার দানিলো লুইজ এবং ফরোয়ার্ড ভিনিসিউস জুনিয়র সবসময়ই বিভিন্ন সামাজিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকেন।
সম্প্রতি ব্রাজিলের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ডানহাতি লেটারাল দানিলো দেশের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ওপর জোর দেন এবং সমাজ গঠনে ফুটবলারদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। মনস্তত্ত্ব ও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী দানিলো তার ইনস্টাগ্রামে ব্রাজিলের বামপন্থী দল 'পিএসওএল'এর ফেডারেল ডেপুটি যাজক হেনরিক ভিয়েরা, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পেজ অনুসরণ করেন। এছাড়া তিনি লেখক ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী অগুস্তো কুরিরও অনুসারী, যা মূলত তার সাহিত্যপ্রেমেরই অংশ।
অন্যদিকে, স্পেনে বারবার বর্ণবাদের শিকার হওয়া ভিনিসিউস জুনিয়র আজ বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক। ২০২৩ সালে মানবিক কাজের জন্য তিনি ব্যালনের ডি’অরের 'সক্রেটিস পুরস্কার' পান। ব্রাজিলের একাধিক রাজ্যে তার নামে বর্ণবাদ বিরোধী আইনও তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্বনেতাদের সমর্থন পেলেও ভিনি কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোট চাননি।
ইনস্টাগ্রাম কে কাকে ফলো করেন
-
নেইমার: জেইর বলসোনারো (সাবেক প্রেসিডেন্ট), ফ্লাভিও বলসোনারো এবং নিকোলাস ফেরেইরা (ডানপন্থী নেতা)।
-
দানিলো লুইজ: যাজক হেনরিক ভিয়েরা (বামপন্থী), বারাক ওবামা, তুকুমা পাতাক্সো এবং কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন পেজ।
-
অ্যালিসন বেকার (গোলরক্ষক): জেইর বলসোনারো, নিকোলাস ফেরেইরা এবং এদুয়ার্দো লেইতে (গভর্নর)।
-
লুকাস পাকেতা ও লিও পেরেইরা: নিকোলাস ফেরেইরা এবং ফ্লাভিও বলসোনারো।
-
ব্রুনো গিমারায়েস: এদুয়ার্দো পায়েস (রিও ডি জেনিরোর মেয়র)।
নেইমার ও বলসোনারো বিতর্ক
ব্রাজিল দলে সরাসরি রাজনীতির মাঠে নামার সবচেয়ে বড় উদাহরণ নেইমার। ২০১৪ সালেই তিনি দিলমা রুসেফের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সমর্থন করেছিলেন। তবে ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি সরাসরি সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর পক্ষে লাইভ অনুষ্ঠানে এসে ভোট চান। নেইমার দাবি করেছিলেন, পারিবারিক মূল্যবোধের প্রশ্নে বলসোনারোর সাথে তার মতাদর্শ মিলে যায়। উল্লেখ্য, এই সাবেক প্রেসিডেন্ট বর্তমানে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত।
নেইমারের এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে গুঞ্জন উঠেছিল যে, ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের ওপর রাজনীতি নিয়ে কথা বলার নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে তৎকালীন কোচ তিতে তা অস্বীকার করে বলেছিলেন, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, তবে তা যেন মাঠের খেলায় প্রভাব না ফেলে।
গোলরক্ষক অ্যালিসন ও ফ্যাবিনহোর স্ত্রীর অবস্থান
২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে লিভারপুলের সাবেক গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার সরাসরি বামপন্থী সরকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তারা ব্রাজিলের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে। স্বভাবতই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডানপন্থী বলসোনারো ও তার অনুসারীদের ফলো করেন।
এদিকে মিডফিল্ডার ফ্যাবিনহো নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ শান্ত থাকলেও, তার স্ত্রী রেবেকা তাভারেস বলসোনারোর কট্টর সমর্থক। ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ বলসোনারোর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান। যা নিয়ে ফ্যাবিনহোর তৎকালীন ক্লাব লিভারপুলের (যে ক্লাবটি ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের সাথে জড়িত) সমর্থকরা বেশ সমালোচনা করেছিলেন।
অক্টোবরে ব্রাজিলে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ব্রাজিলের ফুটবলাররা কে কাকে ভোট দেবেন না নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশটিতে।