কথায় বলে, মানুষের জীবন নাকি শুরুই হয় চল্লিশে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে চল্লিশে পৌঁছানো মানেই ক্যারিয়ারের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এই প্রথম দুই চল্লিশোর্ধ্ব মহাতারকার ‘ক্যাপ্টেনস ডার্বি’ দেখতে চলেছে বিশ্ব। মুখোমুখি হচ্ছেন ১৯৮৫ সালে জন্ম নেওয়া দুই প্রাক্তন রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লুকা মদ্রিচ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা সাতজন ফুটবলারের তালিকায় এই দুজন অন্যতম। রিয়ালের হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিতেছেন একের পর এক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। তবে টরন্টোর এই ম্যাচটি একজনের জন্য নিশ্চিতভাবেই শেষ স্টেশন। ক্রোয়েশিয়ার ম্যানেজার জ্লাতকো দালিচ স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন:
"লুকা মদ্রিচের এটাই শেষ বিশ্বকাপ। এই টুর্নামেন্টকে চমৎকার একটি 'গুডবাই' বলার জন্য ও নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিচ্ছে।"
অন্যদিকে, ২০৩০ সালের যৌথ আয়োজক পর্তুগালের হয়ে রোনালদো আরও একটি বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন মনে মনে দেখছেন কি না, তা কেবল সময়ই বলতে পারে। তবে এই মুহূর্তে আমেরিকার পর কানাডার মাটিতে রোনালদোর বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখানোর লড়াইটা বেশ কঠিনই ঠেকছে।
রোনালদো উজবেকিস্তানের জালে বল পাঠিয়ে হুঙ্কার দিয়েছিলেন, 'আই অ্যাম ব্যাক!'। তবে সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করতে ভালোবাসলেও পর্তুগিজ যুবরাজের আসল পরীক্ষা এই নক-আউট পর্বেই।?
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হলেও, বিশ্বকাপের একক মহিমায় রোনালদোর চেয়ে মদ্রিচ অনেকটাই এগিয়ে। ৪ মিলিয়নেরও কম জনসংখ্যার দেশ ক্রোয়েশিয়াকে মদ্রিচ ২০১৮ সালে ফাইনালে এবং ২০২২ সালে তৃতীয় স্থানে নিয়ে গেছেন। তিনি ২০১৮ সালের গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) বিজয়ী, একই বছর ব্যালন ডি'অর জিতে রোনালদো-মেসির একচেটিয়া রাজত্ব ভেঙেছিলেন। সেই বছর ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কারের ভোটাভুটিতে রোনালদো নিজেই ভোট দিয়েছিলেন এই ক্রোয়াট জাদুকরকে।
রিয়াল মাদ্রিদে দীর্ঘ ৬ বছর একসাথে কাটানোর সময় মদ্রিচ ছিলেন খেলার নিয়ন্ত্রক, আর রোনালদো ছিলেন ফিনিশার। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে চার-চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর ৩৩ বছর বয়সে রোনালদো রিয়াল ছাড়েন। অথচ মদ্রিচ ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত রিয়ালে থেকে আরও দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ উঁচিয়ে ধরেন। দীর্ঘায়ু এবং ধারাবাহিকতার দিক থেকে দুজনেই অনন্য।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০-র বেশি ম্যাচ খেলা ইতিহাসের মাত্র চারজন ফুটবলারের মধ্যে এই দুজন অন্যতম। বিশ্বকাপে রোনালদো ২৫টি এবং মদ্রিচ ২২টি ম্যাচ খেললেও, বিশ্বমঞ্চে এর আগে কখনো তাঁরা মুখোমুখি হননি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মোট ২৩২ বার তাঁরা একই মাঠ ভাগ করে নিয়েছেন, যার মধ্যে ২২২ বার রিয়ালের হয়ে এবং ১০ বার প্রতিপক্ষ হিসেবে।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে লুকা মদ্রিচ কখনো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিরুদ্ধে জয়ী দলে থেকে ম্যাচ শেষ করতে পারেননি।
আজকের ম্যাচেও যদি সেই ধারা বজায় থাকে, তবে ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক ফুটবলার মদ্রিচ আজীবনের মতো বিশ্বকাপকে বিদায় জানাবেন। আর যদি পাশা উল্টে যায়, তবে গত দুই দশক ধরে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ছোঁয়ার যে আকুল প্রার্থনা রোনালদো করে আসছেন, তা হয়তো চিরকালের জন্যই শেষ হয়ে যাবে।