বিলম্বের উদ্দেশ্য টেকসই উত্তরণ

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা থেকে কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে এসেছে সরকার। এ বিলম্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল উত্তরণ নিশ্চিত করা।

গতকাল বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির যৌক্তিকতা’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।

তিনি বলেন, ‘উত্তরণের এই অতিরিক্ত সময় আমরা কোনো বিলম্বের জন্য চাই না; বরং একটি টেকসই, স্থিতিশীল এবং কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য চাই।’

জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের কথা ছিল। তবে, ক্রমবর্ধমান সংকট ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কার কথা উল্লেখ করে সরকার ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য এই সময় পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সময় দিতে এই সময়সীমা বৃদ্ধিকে সমর্থন করেছে ।

তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ ও বিদ্যমান পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি) বাংলাদেশের অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে দাখিল করেছে। এখন ইকোসক বর্ধিত প্রস্তুতিকালের বিষয়টি বিবেচনা করে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণসংক্রান্ত প্রস্তুতি কার্যক্রম ও তা বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি এবং সুষ্ঠু ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে এই প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাংলাদেশে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনসমূহ, উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যান্য অংশীজনকে বিশদভাবে অবহিত করার লক্ষ্যে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির কাছে বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়।

তিনি বলেন, প্রস্তুতিমূলক সময়ে বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপ, সরবরাহ চেইনে বিঘœতা, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। তাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করা।

জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এলডিসি উত্তরণের জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়। তাই অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময় দরকার।

সেমিনারে উপস্থিত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনীতি ও দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মেয়াদ বৃদ্ধি ও উন্নয়ন অংশীদারদের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংকট কাটিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সবার সহযোগিতা অপরিহার্য।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কাঠামোগত ও আন্তর্জাতিকভাবে বিদ্যমান প্রধান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেন। তিনি সুষ্ঠু ও টেকসই এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারের কৌশলগত অগ্রাধিকারসমূহ এবং প্রস্তাবিত প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির সময়টি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রণীত সময়াবদ্ধ একটি রোডম্যাপও তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) গীতাঞ্জলি সিং, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, ফুটওয়্যার লেদারগুডস অ্যান্ড এক্সেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) প্রতিনিধিরা।

এ ছাড়া সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরাও সেমিনারে বক্তব্য দেন। সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা টেকসই এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত, থিংক ট্যাঙ্ক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।