বিশ্বের দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। আর এই সীমান্তেরই একটি অংশের জলাভূমি এলাকায় মেগাফোনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সদস্যরা বারবার একটি ঘোষণাই দিচ্ছেন। আর তা হলো, ‘মানুষকে জোর করে এপারে পাঠাবেন না।’ এভাবে রাতের আঁধারে জোর করে হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে ভারত, যার অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি দেশটির পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের ‘পুশইন’ বেড়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এসব পুশইনের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। যাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে, তাদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থাকেননি, এমনকি কেউ কেউ কখনোই বাংলাদেশে বসবাসও করেননি। আর ভারত থেকে মানুষকে জোর করে বিতাড়নের এই ঘটনা দুই দেশের নাজুক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমান্তে এ পরিস্থিতির কারণে বাড়তি সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ড্রোন নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার এই অভিযান শুরু করে। এ সময় প্রধানত কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি এবং মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আটক ও বিতাড়নের জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ে তোলা হয়।
বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘ভারতের সীমান্তের গেট খুলে মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে নারী ও শিশুও আছে। এসব অসহায় মানুষ সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ে যাচ্ছেন।’ তিনি দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকে থাকা বহু মানুষের কথা উল্লেখ করে এই মন্তব্য করেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান মীনাক্ষী গাঙ্গুলী অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে বেশিরভাগ মুসলিম পরিবারকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে যাচ্ছে। ভারত সরকারের উচিত অবৈধভাবে মানুষকে বিতাড়ন বন্ধ করা, আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা এবং মুসলিমদের প্রতি এই বৈরী মনোভাবের অবসান ঘটানো।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত জুন মাসে কলকাতায় বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিতাড়ন করা হয়েছে। আরও ১৮শ জন বিতাড়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। আর ভারতের এই নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি এখনো ভারত সফর করেননি। ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে ফেরত পাঠানো হাজার হাজার অভিবাসীকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তারা (ভারত) এভাবে মানুষকে সীমান্তের এপারে ঠেলে দিতে পারে না’।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।