ওইয়ারজাবালের জোড়া গোলে শেষ ষোলোতে স্পেন

“টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, আসল বিশ্বকাপ তো শুরু হয় নকআউট থেকে”—ম্যাচের আগে তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালের করা এই মন্তব্যই যেন আভাস দিচ্ছিল নকআউটে স্পেনের এমন কামব্যাকের। ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়ামালের সেই বক্তব্যকে মান দিয়ে দাপুটে ফুটবলে ফিরল ইউরোপিয়ান জায়ান্টরা।

২০১০ সালে বিশ্বজয়ের পর দীর্ঘ এক যুগ কেটে গেলেও বিশ্বকাপের নকআউটে স্পেনের সেই চেনা টিকিটাকা আর দাপুটে ফুটবলের দেখা মিলছিল না। ২০১৪ আসরে গ্রুপপর্বে বিদায় এবং ২০১৮ ও ২০২২ আসরে তারা বিদায় নিয়েছিল শেষ ষোলোতেই, কোনো নকআউট ম্যাচ না জিতে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে স্পেন এবার কেবল শেষ ষোলোর টিকিটই কাটেনি, বরং ১৬ বছর পর প্রথম নকআউট ম্যাচ জিতে পুরো ফুটবল বিশ্বকে জানান দিয়েছে; তারা আবার সেই পুরনো ও অপ্রতিরোধ্য স্পেনে রূপ নিয়েছে। মিকেল ওইয়ারজাবালের জোড়া গোল এবং পেড্রো পোরোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোলের ওপর ভর করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল কোয়ার্টারে ওঠার লড়াইয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই স্প্যানিশ ফুটবলের চিরচেনা আধিপত্য মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ম্যাচের বয়স যখন এক মিনিটও ছোঁয়নি, তখনই লামিন ইয়ামালের চতুর কাউন্টার অ্যাটাক থেকে নেওয়া শট অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার প্রতিহত করলে ম্যাচের সুর বেঁধে দেয় স্পেন। অস্ট্রিয়া হাই প্রেস খেলে স্পেনকে বোতলবন্দী করার চেষ্টা করলেও পেদ্রি, রদ্রি এবং ওলমোর মাঝমাঠের রসায়ন সেই জাল ছিঁড়ে ফেলে। ৩০ মিনিটে কর্নার থেকে মার্ক কুকুরেয়ার একটি গোল ফাউলের অজুহাতে বিতর্কিতভাবে বাতিল হলেও স্পেনের আক্রমণভাগকে থামানো যায়নি। ৩৬ মিনিটে পেদ্রির পাস থেকে বল পেয়ে বাম প্রান্ত দিয়ে কুকুরেয়ার বাড়ানো মাপা মাইনাসকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জালে জড়ান ওইয়ারজাবাল (১-০)। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে আলেক্স বােনার ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া ফ্রি-কিক ক্রসবারে লেগে ফিরে আসলে এবং রিবাউন্ড থেকে ইয়ামালের শট গোলরক্ষক দারুণভাবে রুখে দিলে প্রথমার্ধে আর গোল সংখ্যা বাড়েনি।

দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক মাঝমাঠের শক্তি বাড়িয়ে এবং সাশা কালাদজিচের মতো দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার নামিয়ে ম্যাচে ফেরার জোর চেষ্টা চালান। বদলি নামার ঠিক এক মিনিটের মাথায় কালাদজিচের একটি লুপ হেডারের বল স্পেনের গোলবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে অস্ট্রিয়ার সমতায় ফেরার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। ঠিক এর পরপরই ৬৬ মিনিটে স্পেনের নিখুঁত বিল্ড-আপ ফুটবল থেকে বােনার ক্রসে চমৎকার হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন টটেনহ্যাম ডিফেন্ডার পেড্রো পোরো (২-০)। স্পেনের এই আধিপত্যের রাতে গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করা হলিউড তারকা পেনেলোপে ক্রুজ ও হাভিয়ের বারদেমদের উচ্ছ্বাস তখন বাঁধ ভেঙেছিল।

ম্যাচের ৮৯ মিনিটে অস্ট্রিয়ার ডিফেন্সের চূড়ান্ত অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে কুকুরেয়ার নিখুঁত ক্রস থেকে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করে অস্ট্রিয়ার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন ওইয়ারজাবাল। ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে একটি শটও অন-টার্গেটে নিতে দেয়নি স্পেনের রক্ষণভাগ; যা ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর নকআউট পর্বের ইতিহাসে এই প্রথম। একই সাথে গোলরক্ষক উনাই সিমন টানা চার ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে (ক্লিন শিট রেখে) স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপে এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেনের বিশ্বজয়ের আসরে কিংবদন্তি ইকার ক্যাসিয়াসের গড়া টানা ক্লিন শিটের ঐতিহাসিক রেকর্ডটি ভেঙে নিজের নামে করে নিলেন।

ম্যাচ শেষে স্পেনের এমন নিখুঁত পারফরম্যান্সে ডাগআউটে স্বস্তির হাসি হাসেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। নিজের দলের ওপর গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বড় দলগুলো তখনই জ্বলে ওঠে, যখন তাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। আজ আমরা মাঠে এক দুর্দান্ত ম্যাচ দেখেছি। সব দিক থেকেই আমাদের পারফরম্যান্স ছিল প্রায় নিখুঁত। তবে মাঠে এমন কিছু পরিস্থিতি ছিল যেখানে আমাদের হাই-প্রেসিংয়ের ঘাটতি ছিল। তাই আপনাকে সবসময় আরও উন্নতি করে যেতে হবে।” তিনি তাঁর শিষ্যদের পা মাটিতে রাখার তাগিদ দিয়ে আরও যোগ করেন, “আপনি যখন অতিরিক্ত প্রশংসায় ভাসবেন এবং সেটাকে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, তখনই আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। এই আত্মতুষ্টি কিন্তু আপনাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তবে এই দলের খেলোয়াড়রা সবসময় আরও বেশি কিছু চায়।”

দলের জয়ে জোড়া গোল করে নায়ক বনে যাওয়া ওইয়ারজাবাল তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, “দলের জয়ে এবং পরবর্তী রাউন্ডে যেতে সাহায্য করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এটি একটি কঠিন ম্যাচ ছিল, কারণ অস্ট্রিয়া মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও শারীরিক ফুটবল খেলা দল। তবে আমাদের দিনটি দারুণ কেটেছে।”

বিপরীতে, টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার বেদনায় মুষড়ে পড়েছে অস্ট্রিয়া শিবির। ম্যাচ শেষে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে অস্ট্রিয়ার প্রধান কোচ রালফ রাংনিক বলেন, “১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের শক্তি দিয়ে ম্যাচটা জমিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু ২-০ হয়ে যাওয়ার পর স্পেনের মতো বিশেষ এক প্রতিপক্ষের সামনে ৯০ মিনিট লড়াই করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বল পজেশনে তারা দুর্দান্ত, তাদের পেছনে কেবলই ছুটে বেড়ানো ক্ষ্যাপাটে বিষয়।”

১৬ বছর পর নকআউটের জুজু কাটিয়ে ওঠা এবং শৈল্পিক ও কৌশলী ফুটবলের মেলবন্ধনে গড়া এই স্পেন এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই এক মহা আতঙ্কের নাম।