বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক চরম নাটকীয়তায়। তবে সব নাটকীয়তাকে ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের একটি বিতর্কিত 'ভিএআর' সিদ্ধান্ত। ১০৩ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার করা সমতাসূচক গোলটি আল্ট্রা-মডার্ন 'স্নিকো' প্রযুক্তির সাহায্যে বাতিল হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন ক্রোয়েশিয়ান সমর্থকেরা। ক্ষুব্ধ ভক্তরা মাঠের ভেতর পানির বোতল ছুড়ে মারলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য ম্যাচ বন্ধ থাকে।
কী ঘটেছিল সেই ১০৩ মিনিটে?
ম্যাচের ৯৪ মিনিটে গনসালো রামোসের দুর্দান্ত গোলে পর্তুগাল যখন ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে, ঠিক তখনই শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ম্যাচের ১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে আসা একটি ক্রস মারিও পাসালিচের পায়ে লেগে ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার জোসকো গার্দিওলের পায়ে পৌঁছায়। গাভার্দিওলের শট এক পর্তুগিজ ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে জালে জড়ালে সমতার আনন্দে মেতে ওঠে পুরো ক্রোয়েশিয়া শিবির। ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভিএআর।
মানুষের চোখে অদৃশ্য, প্রযুক্তিতে ধরা!
১. মাতানোভিচের সেই অদৃশ্য স্পর্শ: ক্রোয়েশিয়ার বাঁ প্রান্ত থেকে ক্রসটি পর্তুগালের ডিবক্সে আসে, তখন ক্রোয়েশিয়ার ২০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড় ইগর মাতানোভিচ লাফিয়ে উঠে মাথা দিয়ে বলটি ছোঁয়ার চেষ্টা করেন। খালি চোখে মনে হয়েছিল বলটিতে তাঁর মাথা লাগেনি। কিন্তু বলের ভেতরের চিপ সিগন্যাল দেয় যে, মাতানোভিচের মাথায় বলটির একটি অতি সূক্ষ্ম 'রোজ' বা স্পর্শ লেগেছে।
২. রেফারেন্স পয়েন্টের পরিবর্তন: ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সতীর্থের শরীর স্পর্শ করার পর থেকেই অফসাইডের নতুন সময় গণনা শুরু হয়। চিপের দেওয়া ডেটা অনুযায়ী ঠিক সেই মুহূর্তে ভিডিও ফ্রেমটি ফ্রিজ বা স্থির করে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড লাইন টানা হয়।
৩. পাসালিচের অফসাইড পজিশন: সেই লাইনে দেখা যায়, মাতানোভিচ যখন বলটি চুলে ছুঁয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার ১৫ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড় মারিও পাসালিচ অফসাইড পজিশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
৪.পর্তুগিজ ডিফেন্ডারের অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ: মাতানোভিচের মাথা ছোঁয়ার পর বলটি পাসালিচের কাছে যাওয়ার আগে পর্তুগালের ১৩ নম্বর ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগা বলটি ক্লিয়ার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বলটি তাঁর কাধে লেগে আলতো দিক পরিবর্তন করে পাসালিচের পায়ে গিয়ে পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী, ডিফেন্ডার যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বল পাস না করেন এবং কেবল ডিফ্লেকশন বা অনিচ্ছাকৃত ছোঁয়া লাগে, তবে অফসাইডের আইন বহাল থাকে।
৫. গার্দিওলের গোল: অফসাইড পজিশনে থাকা পাসালিচ বলটি পেয়েই আলতো টোকায় তা বাড়িয়ে দেন গার্দিওলের দিকে এবং গার্দিওল গোলটি করেন। কিন্তু পাসালিচ শুরুতেই অফসাইড থাকায় পুরো গোলটি অবৈধ ঘোষিত হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর মাঠের ভেতর বোতল বৃষ্টি শুরু করেন ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা। পরিস্থিতি শান্ত করতে ক্রোয়েশিয়ার তারকা ইভান পেরিসিক নিজেই গ্যালারির দিকে এগিয়ে যান এবং দর্শকদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানান। পরে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে অফসাইডের প্রমাণ দেখালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিবিসি-র রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড্যারেন ক্যান এই সিদ্ধান্তকে শতভাগ সঠিক উল্লেখ করে বলেন, 'স্নিকো প্রযুক্তি শতভাগ প্রমাণ করেছে যে বলটিতে সতীর্থের মাথা ছুঁয়েছিল। যেহেতু ডিফেন্ডার বলটি ইচ্ছাকৃতভাবে খেলেননি, তাই অফসাইডের নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল হওয়াই যৌক্তিক।'