এইচএসবিসির বিরুদ্ধে ২৫৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ 

রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের আড়ালে আইন লঙ্ঘন করে ২৫৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে বলে এইচএসবিসি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, কর্মীদের ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুসরণ করা হয়নি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এক ধরনের তথ্য দিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলেও কর্মীদের হাতে ভিন্ন ধরনের চাকরিচ্যুতির চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে তারা আইনগত অধিকার ও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ব্যাংকটির সাবেক কর্মকর্তা আলমগীর কবির। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিনিয়র আইনজীবী মোকাররম হোসেন সাকলায়েন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, আনু রায়হান, সুবক্তগিন মাহমুদ, মুস্তাফিজুর রহমান, মনজুর মোর্শেদসহ অন্যরা।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চলতি বছরের ৩১ মার্চ রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে একযোগে ২৫৭ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের মধ্যে অনেকে ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে এইচএসবিসিতে কর্মরত ছিলেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো নথিতে তাদের ‘রিট্রেঞ্চড’ বা ছাঁটাইকৃত কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও হাতে দেওয়া হয়েছে শ্রম আইন অনুযায়ী ২৬ ধারার সাধারণ চাকরিচ্যুতির চিঠি। এর ফলে ছাঁটাইজনিত ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য আইনগত সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

তাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে এক ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হলেও কর্মীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভ্রান্ত করার কৌশল বলেও অভিযোগ করেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুবুর রহমানের ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়। অভিযোগ করা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই তিনি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন। এমনকি কর্মীদের আবেদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিলেও আদালতে এইচএসবিসি দাবি করেছে, ওই নির্দেশনা বাধ্যতামূলক নয়। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে এইচএসবিসির বিরুদ্ধে মোট নয়টি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় দ্বৈত নীতি অনুসরণ, শ্রম অধিদপ্তরকে অবহিত না করা, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ছাঁটাইয়ের নীতি (লাস্ট ইন, ফার্স্ট আউট-এলআইএফও) অনুসরণ না করা, পুনঃনিয়োগে অগ্রাধিকার না দেওয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি থেকে বেআইনি অর্থ কর্তন, ঋণ সমন্বয়ে শ্রম আইন লঙ্ঘন, হোম লোনের সুদের হার বৃদ্ধি, রিলিজ লেটার আটকে রাখা, জোরপূর্বক আইনি অধিকার ত্যাগের দলিলে স্বাক্ষর নেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত উপেক্ষা করা।

ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দাবি, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় একই ধরনের পুনর্গঠনের সময় এইচএসবিসি কর্মীদের অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক।

সংবাদ সম্মেলন থেকে তারা অবিলম্বে পুরো চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়া বাতিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যায্য সেভারেন্স ও ডব্লিউপিপিএফ সুবিধা প্রদান এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য খাত থেকে কেটে নেওয়া অর্থ সুদ-জরিমানাসহ ফেরতের দাবি জানান।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম অধিদপ্তরের প্রতি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানান ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা।