শেকৃবিতে পানির ফিল্টারের অতৃপ্ত তৃষ্ণা, যেন নবাবের সাদা হাতি 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির জোগান দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে হল কর্তৃপক্ষ। হলের পানির ফিল্টার মেশিন নিয়মিত রক্ষাণাবেক্ষণ এবং তা বারবার মেরামতের পেছনে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে বাজেট সংকটে হিমশিম খাচ্ছেন হল সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ অনুসন্ধানে ফিল্টারের কেমিক্যাল ক্রয়, পার্টস ও সামগ্রিক মেরামতের গত ২০ মাসের একটি খরচের খতিয়ান থেকে এই উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে।

জানা যায়, ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও অন্যান্য স্থানে বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহ লক্ষ্যে ৬৪ লাখ ৪০ হাজার টাকায় ১৩টি পূর্ণ সেট পানির ফিল্টার (রিভার্স অসমোসিস) ক্রয় করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ১ হাজার ও ১৫শ লিটার পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ এসব ফিল্টারের প্রতিটি দাম গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৪ টাকা। অথচ ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির অপরাজিতা-২৪ হল কর্তৃপক্ষ নিজ হলের জন্য ৫০০ লিটার ধারণক্ষমতার প্রায় একই ধরনের পানির ফিল্টার ক্রয় করে, যার ২টির মূল্য একত্রে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যা পূর্বে প্রশাসনের ক্রয়কৃত ফিল্টারের চেয়ে প্রায় ৪ গুন কম দাম।

অধিক টাকা ব্যয়ে প্রশাসনের ক্রয়কৃত পানির ফিল্টার হল গুলোতে শিক্ষার্থীদের অনুপাতের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে গড়ে প্রতি হলে ২টি করে স্থাপন করা হয়। ফলে প্রায় ১২শ শিক্ষার্থীর ১০ তলা বিশিষ্ট দুই কক্ষের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের জন্য ২টি আবার ৩ তলা বিশিষ্ট অন্য হলের জন্যও ২টি।

এমন অদূরদর্শী এবং অপরিকল্পিত বণ্টনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি পানির ফিল্টার রক্ষাণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে হিমসিম খাচ্ছে হল প্রশাসন। 

এবিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে হলটির পানির ফিল্টার ১৯বার মেইনটেনেন্স করতে হয়েছে। এতে পানির ফিল্টারের প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও মেরামত বাবদ মোট ২ লাখ ৫ হাজার ৫৭০ টাকা (২০৫,৫৭০) ব্যয় হয়েছে।

হিসাব করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষ ৬ মাসে ১০বার ফিল্টার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১ লাখ ১ হাজার ৫১০ টাকা। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেই বড় অংকের অর্থ ব্যয় হয়, যা যথাক্রমে ২৭,৯৫০ টাকা ও ৩১,৭০০ টাকা।

এছাড়া ২০২৫ সাল ৮ বার ফিল্টারের কেমিক্যাল সংযোজন, উচ্চমূল্যের নতুন যন্ত্রাংশ ক্রয় ও সার্ভিস চার্জ বাবদ খরচ হয়েছে ৮৯,০৬০ টাকা। সর্বশেষ চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত একই খাতে ১৫,০০০ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি ফিল্টার স্থাপনের পর থেকেই বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায় ফলে নিয়মিত পানি সংকটে পরে হল, তবে সাম্প্রতিক এই ২০ মাসের রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য দৈনিক দেশ রূপান্তর বিশ্লেষণ করেছে।

এবিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক) ইঞ্জিনিয়ার মো. আল মামুন সংকটের জন্য শিক্ষার্থীদের পানির অতিরিক্ত অপচয়ের কথা উল্লেখ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা শুধুমাত্র খাবার পানি কিন্তু শিক্ষার্থীরা এটি দিয়ে মুখ-হাত ধোয়া থেকে শুরু করে রান্না পর্যন্ত করে। এই অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মেশিনের উপর চাপ পরে, এটার তো ফিল্টার করার একটা লিমিটেশন আছে।

আর শেকৃবির নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ইঞ্জিনিয়ার মো. মুনির হোসেন বলেন, এই এলাকার পানিতে অনেক আয়রন আর ফিল্টারের মেমব্রেন হলো কিডনির মত, এর উপর চাপ বেশি পরে ফলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফিল্টারের উচ্চ মেইনটেনেন্স খরচের বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অন্য কোথাও (বিশ্ববিদ্যালয়) নাই আমরাই ফাস্ট করছি তবে আমরা ইউজিসির কাছে মেইনটেনেন্স খরচ চেয়েছি।

পানির অপচয় ও সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, যদিও অনুচিত তবে এই হলের শিক্ষার্থীরাই খালি পানি অপচয় করে অন্য হলে হয়না? তাদের তো এত সংকট নাই। এসব হলো অজুহাত কোন প্লান-পরিকল্পনা ছাড়াই উচ্চদাম দিয়ে নিম্ন মানের জিনিস কিনে এখন দু-দিন পরপর খালি নষ্ট আর মেরামতের নামে নতুন নতুন বিল, যত নষ্ট তত বিল। হলের রিজার্ভ ট্যাংকি যে পানি উপচে পরে রাস্তায় হাটা যায় না, হলের ছাদের ট্যাংকি থেকে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি পরে সেসব কার দোষ।

এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ফিরোজ মাহমুদ অধিক খরচের সত্যতা স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, হল চলে শিক্ষার্থীদের টাকায়, প্রশাসন থেকে কোন বরাদ্দ নেই। ফিল্টারের পেছনে যেভাবে ক্রমাগত খরচ করতে হচ্ছে, তাতে হলের অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো আমাদের জন্য হিমশিম খাওয়ার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। আমরা স্থায়ী সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল বিভাগ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলছি।