শহীদ আদিলকে নিয়ে তাসনিম জারার আবেগঘন পোস্ট

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি হৃদয়বিদারক পোস্ট দিয়েছেন।

সোমবার (৬ জুলাই) মধ্যরাতে শেয়ার করা এই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি তুলে ধরেছেন জুলাই আন্দোলনে শহীদ কিশোর আদিলের আত্মত্যাগের গল্প, যা নাড়া দিয়েছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়।

পোস্টে জারা লেখেন, আদিল ছিল দশম শ্রেণির ছাত্র, ২০২৫ সালে তার দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। শহীদ হওয়ার ঠিক আগের দিন চারদিকের উত্তাল পরিস্থিতির মাঝে সে মাকে হঠাৎ প্রশ্ন করেছিল, এত মানুষ যে মারা যাচ্ছে, তাদের মানুষ চেনে কী করে? মা সহজভাবেই জানিয়েছিলেন, পকেটে থাকা আইডি কার্ড দেখে।

পরদিন শুক্রবার সকালে আদিল যখন মায়ের কাছে নিজের আইডি কার্ডটি চাইল, মায়ের মনে তখন অজানা আতঙ্ক। ছেলেকে কড়া শাসনে বাইরে যেতে নিষেধ করে তিনি কার্ডটি লুকিয়ে ফেলেন। মায়ের মন শান্ত করতে আদিল বলে, সে বাইরে নয়, শুধু ছাদেই যাচ্ছে। তবে যাওয়ার আগে মায়ের হাতে নিজের জমানো টাকা থেকে একটি ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলে, ‘বিকেলে আমরা গ্রিল খাব।’ সেই গ্রিল আর খাওয়া হয়নি, তবে ছেলের স্মৃতিমাখা সেই নোটটি আজও সযত্নে আগলে রেখেছেন হতভাগ্য মা।

ছাদে যাওয়ার কথা বলে আদিল মূলত ছুটে গিয়েছিল রাজপথের আন্দোলনে। সেখানেই ঘাতকের বুলেট বিদ্ধ করে তাকে। আইডি কার্ড সাথে না থাকায় তাকে শনাক্ত করতেও অনেকটা দেরি হয়ে যায়। পরে রাস্তায় আন্দোলনকারীদের সহায়তাকারী কয়েকজন ধরাধরি করে আদিলকে বাসায় পৌঁছে দেয়।

বাবা-মা প্রথমে ভেবেছিলেন দ্রুত হাসপাতালে নিলে হয়তো ছেলে বেঁচে যাবে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বুঝতে পারেন আদিল আর নেই। পরে দেখা যায়, আদিলের এক হাতের কব্জিতে এবং পিঠে বাঁধা ছিল জাতীয় পতাকা। এই পতাকাগুলোই বলে দেয়, দেশের জন্য সে নিজেকে বেশ কিছুদিন ধরেই প্রস্তুত করছিল।

এদিকে মায়ের বুকে আজও বাজে অনন্ত আক্ষেপ-যদি আইডি কার্ডটা লুকিয়ে না রাখতেন, তবে হয়তো কেউ আগে চিনতে পারত, হয়তো একটু আগে হাসপাতালে নিলে তার ছেলেটা বেঁচে যেত।

আদিলরা তিন ভাই। বড় ভাই দুবাই থেকে বাবার চিকিৎসার জন্য দেশে এসেছিলেন। তাসনিম জারাকে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন কেউ যখন জিজ্ঞেস করে তারা কয় ভাই, তিনি উত্তর খুঁজে পান না-তারা কি এখন দুই ভাই, নাকি তিন ভাই?

সন্তান হারানো আদিলের বাবার কাছে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজের জন্য কিছুই চাননি। দেশের স্বার্থে তিনি শুধু তিনটি চাওয়ার কথা বলেছেন। প্রথমত, শহীদরা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, তারা গোটা দেশের সম্পদ এবং তাদের নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে যেন দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ সহজে ন্যায়বিচার পায়। এবং তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, কারণ ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থার কারণেই আজ দেশের এই পরিণতি হয়েছে।

পোস্টের শেষে জারা সবার উদ্দেশ্যে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে লেখেন, আদিলরা যে আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ করে দিল, আমরা সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারলাম?