ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষ নেওয়া কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে প্রশাসনে বিভিন্ন সময়ে যারা প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য কাজ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করতে সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার কাজ চলমান রয়েছে। চিহ্নিত করার পর তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

গাইবান্ধা-২ আসনের সদস্য আব্দুল করিমের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার নৈতিক স্খলনজনিত বিষয় দৃষ্টিগোচর হলে তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বিভাগীয় মামলা রুজুক্রমে শাস্তি দেওয়া হয়। এই নৈতিক স্খলন ও শাস্তির তথ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হয়। পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে এ সব বিষয় বিবেচনা করা হয়।

সরকারি চাকরিতে শূন্য পদ ৫ লাখের বেশি, ক্যাডার ৮ হাজার : গোপালগঞ্জ-১ আসনের সদস্য সেলিমুজ্জামানের প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বর্তমানে (৩০ জুন ২০২৬) ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সচিব/সিনিয়র সচিবের ৬৯টি পদের বিপরীতে ৬৭ জন, অতিরিক্ত সচিবের ৩৬৮টি পদের বিপরীতে ৩৭৮, যুগ্ম সচিবের ১ হাজার ১১৬ পদের বিপরীতে ৮৯৩ জন এবং উপসচিবের ২ হাজার ২৪৫টি পদের বিপরীতে ২ হাজার ৯৪০ জন কর্মরত রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ৩ হাজার ৭৯৮ পদের বিপরীতে ২ হাজার ৯৪০ জন কর্মরত আছেন।

সংরক্ষিত আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী জানান, ৫০তম বিসিএসে বিজ্ঞপ্তির এক বছরের মধ্যে ফল প্রকাশ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

আদালতে বিচারাধীন ৪৬ লাখ মামলা, উচ্চ আদালতেই সাড়ে ৫ লাখ : আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যশোর-৪ আসনের সদস্য মো. গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে সাড়ে ৫ লাখের বেশি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অপরদিকে, দেশের সব অধস্তন আদালত মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। সব মিলিয়ে দেশের আদালতগুলোয় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি। তিনি বলেন, মামলার জট কমানো এবং দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ন্যয়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, পলাতক আসামিদের ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০-এর বিধি ৪৩ এবং বিধি ৪৫ সি অনুযায়ী ১৭টি মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সরকারি খরচে ৪৪ জন আইনজীবীকে স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যারা প্রকৃত অপরাধ করেছেন শুধু তাদের বিচার নিষ্পত্তি করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পুনর্গঠন করা হয়। বর্তমানে উভয় ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

‘আমার হাতে পুলিশ নেই, মুরগি আছে’ : গতকাল স্পিকারের মাধ্যমে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার কাছে নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি বা থানা স্থাপনের দাবি জানান সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নৌ-পুলিশের বিষয়ে প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর কাছে দাবি তোলায় স্পিকার ও মন্ত্রীর মন্তব্যে পুরো সংসদ কক্ষে হাসির রোল পড়ে। ফরিদা ইয়াসমিন কুষ্টিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং নদীপথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা তুলে ধরেন।

এ সময় স্পিকার তাকে থামিয়ে জানতে চান, তিনি এই প্রশ্নটি প্রাণিসম্পদমন্ত্রীকে করছেন কি না এবং প্রাণিসম্পদমন্ত্রী কীভাবে নৌ-পুলিশের থানা স্থাপন করবেন। জবাবে ফরিদা ইয়াসমিন আবারও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছেই নৌ-পুলিশের থানা স্থাপনের আবেদন জানান। তখন স্পিকার রসিকতা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার আন্ডারে থানা-পুলিশ কিছু আছে কি-না, উত্তর দিন। জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ হেসে বলেন, পুলিশ তো আমার হাতে নেই। তবে আমার কাছে মুরগি আছে। রসিকতা করে তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় যদি আমার মন্ত্রণালয়ের রিজার্ভের মাছ কেউ ধরে, তাহলে সেই অসিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কিছু পুলিশ পাঠানোর অনুরোধ করতে পারি। এর বাইরে এ বিষয়ে আমার আর কিছু করার নেই। পরে স্পিকার ফরিদা ইয়াসমিনকে বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উত্থাপনের পরামর্শ দেন।

এনসিপির সমাবেশে হামলা তীব্র ক্ষোভ আখতার হোসেনের : সাভারে সোমবার (৬ জুলাই) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পথযাত্রা’ কর্মসূচির সমাবেশে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং পরে বিস্ফোরণের ঘটনায় সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। আখতার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা যখনই জুলাইয়ের চেতনাকে কেন্দ্র করে কোনো আন্দোলন, সংগ্রাম বা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তখনই একটি নির্দিষ্ট মহল নানাভাবে তাদের বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বিরোধী দলের সাংবিধানিকভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে সংসদে ব্যাখ্যা দাবি করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে জবাব দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সাভারের ঘটনাটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। হামলার ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।