রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল চর আষাড়িয়াদহ। পদ্মা নদীর মাধ্যমে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এই জনপদ। পিছিয়ে পড়া এই জনপদে বসবাস প্রায় ৪০ হাজার মানুষের। নাগরিক সুবিধার অনেকগুলো থেকেই বঞ্চিত এই চরের মানুষ। বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা। এখানে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও মানুষের তেমন কাজে আসে না। প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশকের বেশি সময় এটি চিকিৎসকশূন্য। এ পর্যন্ত কোনো মেডিকেল অফিসার পদায়ন না হওয়ায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন নৈশপ্রহরী দিয়েই চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও নেই চিকিৎসক, পর্যাপ্ত জনবল কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও। সাধারণ চিকিৎসার জন্যও রোগীদের গোদাগাড়ী উপজেলা সদর বা রাজশাহী শহরে যেতে হয়। আর গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিয়ম অনুযায়ী এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন মেডিকেল অফিসারসহ ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মেডিকেল অফিসারের পদটি কখনোই পূরণ হয়নি। ফলে ওষুধ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্টকেই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, হাসপাতাল থাকলেও আমাদের কোনো উপকারে আসে না। সেখানে ডাক্তার নেই, ঠিকমতো চিকিৎসাও পাওয়া যায় না। ছোটখাটো অসুখ হলেও অনেক দূরে যেতে হয়। গুরুতর রোগী হলে নৌকায় করে উপজেলা বা রাজশাহী শহরে নেওয়ার আগেই অনেক সময় রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
হাসপাতালের নৈশপ্রহরী আমির হোসেন জানান, তিনি নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে নিয়োগ পেলেও এখন তাকে সবকিছুই করতে হয়। পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণে হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং রোগীদের সহযোগিতাসহ অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে তাকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট রুহুল আমিন বলেন, এখানে আমার ১৭ বছর চাকরি হলো। এই সময়ে একজন মেডিকেল অফিসারও পাইনি। রোগী দেখা আমার দায়িত্ব নয়। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের কথা ভেবে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দিচ্ছি। গুরুতর রোগী এলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি।
আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম (ভোলা) বলেন, ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। সামান্য চিকিৎসার জন্যও মানুষকে উপজেলা সদর কিংবা রাজশাহী শহরে যেতে হয়।
রাজশাহী জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চরের মানুষের চিকিৎসায় কিছুটা সংকট রয়েছে। আষাড়িয়াদহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, এটি পূরণ করার চেষ্টা চলছে। কিছু চিকিৎসক নিয়োগের ছাড়পত্রও হয়েছে। সেগুলো হলে চরের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম. রাজিউল করিম দাবি করেন, আষাড়িয়াদহ চরাঞ্চলে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতি মাসে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়। সেখানকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্র্যাকের সহযোগিতায় একটি মাতৃস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা স্বাভাবিক প্রসবসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করবেন। দু-এক মাসের মধ্যে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হবে। এ উদ্যোগে স্বাস্থ্য বিভাগ সহযোগিতা করছে।