রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, শেয়ারবাজার সংস্কার ও স্মার্ট কৃষিতে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা

রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও আলোচনা চালাবে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে অতীতের অনিয়ম ও কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার সংস্কার এবং কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্মার্ট খাতে রূপান্তরের লক্ষে একগুচ্ছ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।

বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যের লিখিত ও মৌখিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সরকার কেবল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের সঙ্গেই নয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও আলোচনার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি মূলধারার কূটনীতির বাইরে আস্থা তৈরির (কনফিডেন্স বিল্ডিং) বিভিন্ন প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক, সব পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। অতীতে ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় সফল কূটনৈতিক উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। বর্তমান সরকারও সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় কার্যকর সমাধানের পথ অনুসন্ধান করছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রত্যাবাসনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই (ভ্যারিফিকেশন) কার্যক্রম নিয়মিত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার জাতিসংঘ, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী এবং দাতা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে, যাতে রোহিঙ্গা সংকট বৈশ্বিক মানবিক ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব পেতে থাকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউএনএইচসিআর, ইউএন উইমেন ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এর ফলে দেশটির মানবিক সহায়তা আরও বাড়বে বলে সরকার আশা করছে। তিনি বলেন, সরকার মনে করে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নিহিত। এ কারণে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রতিও বাংলাদেশের নৈতিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

সংসদে আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি জানান, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়েছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে কি না, তা উদঘাটনের কার্যক্রমও চলমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন ও তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে বাজার কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, আইপিও ও বন্ড ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, নীতিগত অসঙ্গতি এবং বিনিয়োগবান্ধব করনীতির অভাবকে শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট এক হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দুদকে পাঠানো হয়েছে। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে দক্ষ নেতৃত্বে নতুন বিএসইসি কমিশন গঠন, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, সরকারি ও বহুজাতিক লাভজনক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেওয়া, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, আধুনিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সহজীকরণ, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, অনলাইন বিও হিসাব, এআইভিত্তিক নজরদারি এবং বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়ন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে।

কৃষি খাত নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও টেকসই খাতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, কৃষক নিবন্ধন, কৃষক ডাটাবেজ, ডিজিটাল কৃষিসেবা, মোবাইলভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর, কৃষি পরামর্শ এবং অনলাইন সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হবে। এ লক্ষে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিতে রিমোট সেন্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ড্রোন, জিপিএস, স্যাটেলাইট তথ্য এবং বিগ ডাটার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে।

তিনি জানান, তথ্যনির্ভর প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার চালুর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেও সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের জন্য চালু করা ‘খামারি অ্যাপ’-এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কোন ফসল উপযোগী, কী পরিমাণ সার প্রয়োজন এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ বিভিন্ন কৃষি পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের কৃষি আরও উৎপাদনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও টেকসই খাতে পরিণত হবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।