টানা বর্ষণে ভোলাজুড়ে জলাবদ্ধতা, পানিবন্দি হাজারো পরিবার

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে উপকূলীয় জেলা ভোলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) পর্যন্ত অব্যাহত বৃষ্টিতে জেলার ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরার বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায়। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক, ফসলের মাঠ, খেলার মাঠ ও নিচু এলাকা হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে ডুবে গেছে। কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চার ফুট পানি জমে থাকায় অনেক পরিবার কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ সাকুচিয়া, উত্তর সাকুচিয়া, হাজিরহাট ও মনপুরা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও একই চিত্র দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টিতে বাড়ির উঠান, রান্নাঘর ও চলাচলের পথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুসহ বৃদ্ধদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পরিবারগুলো।

অন্যদিকে ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন ও চরফ্যাশনের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও জলাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েকটি এলাকায় আমন ধানের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ও মৎস্যচাষীদের মধ্যে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মনপুরার হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা সফিজল হাওলাদার বলেন, বৃষ্টি হলেই এলাকায় পানি জমে যায়। পানি নামার পথ না থাকায় কয়েক দিন ধরে মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, স্লুইসগেটগুলো সচল থাকলে এত দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকত না। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নেও জলাবদ্ধতায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুই হাজারের বেশি পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। স্থানীয় উদ্যোগে বড় পাইপ বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অনেক খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। একই সঙ্গে কয়েকটি স্লুইসগেট অকেজো হয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

টানা বর্ষণের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, জেলে, রিকশাচালক ও অন্যান্য নিম্নআয়ের মানুষ। কাজ বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারের আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভোলা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্লুইসগেট মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।

এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে জেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। দ্রুত পানি নিষ্কাশন, অকার্যকর স্লুইসগেট সংস্কার এবং খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন তারা।