একসময় হোয়াংহো বা পীত নদীকে বলা হতো ‘চীনের দুঃখ’। প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। অন্যদিকে ইয়াংসি নদীর বিপুল সম্ভাবনাও দীর্ঘদিন পরিকল্পনার অভাবে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে আজ এই দুই নদী চীনের কৃষি, শিল্প, জ্বালানি, নৌপরিবহন ও আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও সমস্যার প্রকৃতি অনেকটাই একই। শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট, বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন, কৃষির অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে তিস্তা অববাহিকার প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের অন্যতম ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো একক নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের সমন্বিত অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের রূপরেখা। নদী খনন, নদীশাসন, পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, শাখা নদীর পুনরুজ্জীবন, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ , ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, জলাভূমি সংরক্ষণ,বনায়ন, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, কৃষিভিত্তিক শিল্প কলকারখানা স্থাপন, শিল্পায়ন, নবায়িত জ্বালানি কেন্দ্র তৈরি ও পরিকল্পিত নগরায়ণ—সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা করেই এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়ার অগ্রাধিকার প্রকল্প 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা'। এগুলো হবে রাষ্ট্রীয় তদারকিতে পরিকল্পিতভাবেই।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে খনন প্রক্রিয়ায় উদ্ধার হবে ১৭০ বর্গকিলোমিটার জমি; যার আনুমানিক সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। উদ্ধারকৃত জমি উৎপাদনমুখী করা গেলে মুল্য সংযোজন হবে বহুগুণ। কর্মসৃজন হবে ৭ লাখের ওপরে।চিরায়ত দারিদ্র্য ও বৈষম্যের শৃঙ্খল ভেঙ্গে উত্তরাঞ্চল নবজাগরণের বৃত্তে প্রবেশ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর তাই উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। সফর শেষে জাতীয় সংসদে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘যে কোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’ দীর্ঘদিনের জনদাবির পর এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এখন প্রয়োজন ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন।
এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ তিস্তা তীরবর্তী পাঁচ জেলায় আলোর মিছিল করেছে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পর এখন একনেকে অনুমোদন, সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং দৃশ্যমান কাজ শুরুর মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে অযথা ভূরাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ নেই। কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা চীন, ভারত কিংবা অন্য কোনো দেশের প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প। কার কাছ থেকে কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণের অধিকার একান্তই বাংলাদেশের।
চীনের সঙ্গে কারিগরি সহযোগিতার প্রশ্নটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে নয়; বরং নদী ব্যবস্থাপনা, বৃহৎ নদী পুনর্বাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মেগা অবকাঠামো নির্মাণে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণেই। হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের অর্জন আজ বিশ্বস্বীকৃত। বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইলে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনো দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। পদ্মা সেতুর রিভার ট্রেনিংয়ে যেমন বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি তিস্তা মহাপরিকল্পনাও প্রয়োজন অনুযায়ী বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে। কিন্তু সহযোগিতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অর্থায়নের বিষয়েও বাস্তবসম্মত কৌশল প্রয়োজন। বিদেশি ঋণ উন্নয়নের একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণকেই বহন করতে হবে। তাই জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে পদ্মা সেতুর মতো জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজস্ব অর্থায়নের পথও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের আদলে তিস্তা বন্ড চালু করে জনগণের অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। পাশাপাশি তিস্তা অববাহিকার বালু ও পাথর আহরণ থেকে সরকারের যে রাজস্ব আয় হয়, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ এই প্রকল্পে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের একটি টেকসই ভিত্তি গড়ে উঠবে।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে ছয় দফা দাবি জানিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত একনেকে প্রকল্প অনুমোদন, সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ, তিস্তা বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, তিস্তা বন্ড চালু এবং প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত সরকারি রাজস্বের একটি অংশ প্রকল্পে বিনিয়োগ। এসব দাবি কেবল আন্দোলনের স্লোগান নয়; বরং প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার একটি নীতিগত কাঠামো।
নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন এখন বিশ্বের বহু দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। বাংলাদেশও যদি তিস্তাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটন, সীমান্ত বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও নতুন বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হবে। এর সুফল শুধু রংপুর বিভাগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।
এখন সবচেয়ে জরুরি তিনটি সিদ্ধান্ত—দ্রুত একনেকে অনুমোদন, সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ ঘোষণা এবং প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ শুরু। উত্তরাঞ্চলের মানুষ আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন মানে শুধু একটি নদীর পুনরুদ্ধার নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি, উন্নয়ন বৈষম্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ।
লেখক: সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ