পটুয়াখালীতে খাসজমি দখল করে বরফকল নির্মাণ!

পটুয়াখালীর চর মোন্তাজ ইউনিয়নে সরকারি খাস জমি দখল করে বরফকল নির্মাণের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরভূমি থেকে অবৈধ ভাবে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দিয়ে ভরাট করে সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণ ও বরফকল নির্মাণের বিষয়টি প্রশাসনের তদন্তে উঠে এসেছে।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর, পটুয়াখালী কার্যালয় থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র না দিয়ে বিধিমালার আলোকে বরফ কলটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ও স্থানান্তর করতে নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। এরই মধ্যেই অবৈধ স্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগ আনা হয়েছে। নিয়মনীতি না মেনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনেও রবফকলের স্থাপনাটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে উচ্ছেদের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়নের লঞ্চঘাটসংলগ্ন এলাকার পূর্ব পাশে মানতা কলোনির দক্ষিণে নদীর তীরভূমিতে বরফকলের জন্য অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। নদীর তীর থেকে মাটি কেটে ভরাটের পর সেখানে ইট-বালুর পাকা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। মো.আবুল কাসেম নামে এক ব্যক্তি এই  বরফকল স্থাপন করছেন। নাম দেওয়া হয় আসিফ আইচ ফ্যাক্টরী।

আবুল কাসেম তার বরফকলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্রের জন্য গত ৭ মে আবেদন করলে তা এবং বরফকলটি বন্ধপূর্বক স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর পটুয়াখালী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিলের গত ৭ জুন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, আপনার আসিফ আইচ ফ্যাক্টরী বরফকলটির উত্তর সীমানায় আবাসিক এলাকা। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ মোতাবেক নিম্নবর্ণিত স্থানে কোন প্রকার শিল্প কারখানার প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। উপরোক্ত বিধিমালা অনুসরণে আপনার বরফকলের অনুকূলে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করার আইনগত সুযোগ নেই। বিধিমালার আলোকে আপনাকে আপনার মালিকানাধীন আসিফ আইচ ফ্যাক্টরী নামক বরফকলটির সকল ধরনের কার্যক্রম (নির্মাণ কার্যক্রমসহ) বন্ধপূর্বক স্থানান্তর করে অবহিত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।

অন্যথায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, (সংশোধিত-২০১০) ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩, অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনাপূর্বক নির্দেশ অমান্য করার কারণে ক্ষতিপূরণ আদায় করা কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই চিঠির এক মাস পেরিয়ে গেলেও স্থানান্তর হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, আমাদের চিঠির এখনও কোন উত্তর আমরা পাইনি। দ্রুত আমরা আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করবো।

এদিকে বরফকলটিতে বিদ্যুৎ সংযোগও আনা হয়েছে। তবে এই সংযোগ আনার ব্যাপারে কোন ধরনের নিয়মনীতি মানা হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পটুয়াখালীর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে হলে অবশ্যই নিজস্ব জমি থাকতে হবে এবং এর অনুকূলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকতে হবে। তবে চর মোন্তাজ ইউনিয়নের খাস জমিতে কিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আসলে চর মোন্তাজ আমাদের আওতায় নেই। সেখানে ভোলার চর ফ্যাশন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চর ফ্যাশন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (দক্ষিন অঞ্চল) মার্কেটিং কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, আসলে বরফকলের বিদ্যুৎ সংযোগটি ছিল চর ফ্যাশনের খেজুরবাড়ী এলাকার বরফকলের। আবেদনের প্রেক্ষিতে সেখান থেকে স্থানান্তর করে চর মোন্তজে নেওয়া হয়েছে। তবে চর মোন্তজের বরফকল এলাকা খাস জমি তা তারা জানেন না।

সরকারি খাস জমিতে অবৈধ ভাবে বরফ কল নির্মাণ প্রসঙ্গে বরফকলের মালিক আবুল কাসেম এ প্রসঙ্গে কথা বলতে রাজী হননি।

এদিকে খাস জমি দখল করে বরফকল নির্মাণ বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চর মোন্তাজ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আবু ইউসুফ মো. সরোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ইউনিয়নের তহশিলদার হামিদুল হক বাচ্চু এবং সার্ভেয়ার মো. আনসার উদ্দিন। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত ১১ মে তদন্ত কমিটি সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ১৩ মে জেলা প্রশাসক বরাবরে তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহসিন উদ্দিন জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে স্থাপনাটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবৈধ এই স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ আইনগত ব্যবস্থার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাবনা পাঠাতে বলা হয়েছে। উচ্ছেদের বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন।

উল্লেখ্য, গত ৫ জুন দেশ রূপান্তর পত্রিকার ২ এর পাতায় ‘নদীর তীর দখল করে ‘বরফকল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।