দেশের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিকায়নে তিনটি বড় খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনসহ ‘জাতীয় নবায়নেযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ এবং ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়।
চলতি মেয়াদের সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর গতিশীল করতেই এই সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
দেশে বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ ও দ্রুত করতে বড় ধরনের সংস্কার আনছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে তৈরি ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া আজ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
নতুন এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো–বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপি) কার্যক্রমকে একক কাঠামোর আওতায় আনা। প্রস্তাবিত এই নতুন কর্তৃপক্ষই হবে দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা।
এর ফলে বিনিয়োগকারীরা একটি মাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ‘সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’-এর মাধ্যমে লাইসেন্স, অনুমোদন ও নিবন্ধনসহ যাবতীয় সরকারি সেবা পাবেন। এতে বিভিন্ন সংস্থার কাজের দ্বৈততা কমবে। এ ছাড়া সরকারের অব্যবহৃত জমি, স্থাপনা বা শেয়ার উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে এই আইনে। ক্ষুদ্র পিপিপি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিজেই সহজ পদ্ধতিতে অনুমোদন দিতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যুৎ বিভাগের তৈরি ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ৩১টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এই কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য–আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অন্তত ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে এই কৌশলপত্রে রুফটপ সোলার, স্মার্ট গ্রিড, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ শুল্ক ছাড় ও কর অবকাশের (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গঠন করা হবে একটি বিশেষ ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফান্ড’। এই খাতের প্রযুক্তিগত জনবল তৈরিতে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পুরো কার্যক্রম তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ‘জাতীয় পলিসি কাউন্সিল’ ও রিয়াল-টাইম অনলাইন মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
নতুন নীতি আদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে অর্থ পরিশোধ পদ্ধতিতে। এখন থেকে প্রচলিত এলসি বা লেটার অব ক্রেডিটের পাশাপাশি ‘ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি’ (সেলস কনট্রাক্ট) এবং ওপেন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মূল্যসীমা ছাড়াই পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের ব্যবসায়ীরা।
রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কাঁচামাল ‘ফ্রি অব কস্ট’ (এফওসি) বা বিনা মূল্যে আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও পুনঃরফতানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
নতুন নীতি আদেশে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। প্রবাসীরা যাতে দেশে এসে সহজে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপন করতে পারেন, সে জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর প্রমাণিত কয়েকটি কীটনাশক আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে দেশের প্রাণিসম্পদের প্রজনন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট প্যাথোজেনমুক্ত (এসপিএফ) এবং বিএসই-মুক্ত গরু, মহিষ ও ছাগলের সিমেন আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে।