আকাশভ্রমণের সীমা বাড়ানোর ফাঁকা বুলি!

দেশের পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো সংস্কার করে দ্রুত চালু করা হবে এমন আশ্বাস গত দুই বছর ধরে আবার শোনা যাচ্ছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) শীর্ষ কর্তাদের মুখে। তারা বলছেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে আটটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর সচল করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বাস্তবে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের হাঁকডাকেই আটকে আছে প্রতিশ্রুতি। মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। প্রাথমিক ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ বা টেকনিক্যাল সার্ভের উদ্যোগও নেই; সংস্কারের বাজেট, রানওয়ের সীমানা নির্ধারণ, ভূমি অধিগ্রহণ তো অনেক পরের কথা।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে আকাশপথে ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। সড়কে যানজটের বিড়ম্বনা এড়াতে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আকাশপথ। ফলে অ্যাভিয়েশন খাত লাভজনক হয়ে উঠছে। বর্তমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল ও রাজশাহী বিমানবন্দর দিয়ে বিমান চলাচল করছে। আর দীর্ঘদিন ধরে দেশের আটটি বিমানবন্দর পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব বিমানবন্দরের মধ্যে চারটির সংস্কার করে সচল করার পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো নতুন করে ‘ভাবনায়’ নেয়। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে অচল বিমানবন্দরের ইস্যুটি। বিশেষ করে আটটি বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে চালুর প্রতিশ্রুতি নতুন করে শোনা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বেবিচককে বেশ কিছু নিদের্শনা দিলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বেবিচক কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে অন্তত তিনটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু করার চিন্তাভাবনা থাকলেও এখনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের পাশাপাশি বরিশাল বিমানবন্দরে আবারও ফ্লাইট চালু করতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রারের সঙ্গে বেবিচক বিশেষ বৈঠক করলেও ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যায়নি।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নামগন্ধ নেই : অ্যাভিয়েশন খাতের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বন্ধ বা নতুন বিমানবন্দর চালু করতে হলে প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। সেখানে কোন ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারবে (রানওয়ে পিসিএন বা পেভমেন্ট ক্লাসিফিকেশন নাম্বার), যাত্রী চাহিদা কেমন হবে, এয়ারলাইনসগুলোর জন্য রুটটি লাভজনক হবে কিনা, আশপাশে নেভিগেশনাল বাধা বা প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা, রানওয়ে তৈরি করতে কত খরচ হবে, যাত্রী টার্মিনাল কোন ধরনের হবে, ট্রাফিক কন্ট্রোলে কত টাকা খরচ হবে, বিমানবন্দরের জনবল কেমন হবে, সবকটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর সংস্কার শেষে চালু করতে কত টাকার বাজেট লাগবে সেসব হিসাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) উপস্থাপন ও পাস করার বিষয় থাকলেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখছি। সব সরকারই এসে বলে দেয় পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো আবার চালু করবে। কিন্তু বাস্তবতা কেউ বুঝতে চায় না। মন্ত্রণালয় আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে যেভাবেই হোক বিমানবন্দরগুলো চালু করতে হবে। অনেকটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের ওপর।’

বিভিন্ন জটিলতার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দর সব ধরনের প্রস্তুতি থাকার পরও সেখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। কবে চালু হবে নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। একইভাবে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো কবে সচল করা যাবে আমরা তাও বলতে পারছি না।’

পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলোর হাল : দেশে বর্তমানে সচল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের বাইরে আটটি বিমানবন্দর সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো হলো ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, বগুড়া, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), কুমিল্লা, বাগেরহাট (খানজাহান আলী) এবং পটুয়াখালী। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মানুষের বিমানে যাতায়াত করতে সিলেট বিমানবন্দরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় লাগছে বেশি। পাশাপাশি শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে ওই দুই জেলা অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে। নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে কুমিল্লা বিমানবন্দর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সচল ছিল। ১৯৯৪ সালে আবার ফ্লাইট চালু হলেও যাত্রীসংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বিমানবন্দর-সংলগ্ন ইপিজেড থাকলেও যোগাযোগ সমস্যার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে আশির দশকের পর লালমনিরহাট বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল করেনি। বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করতে ২০১৫ সালে একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে চারপাশের দেয়াল নির্মাণ ছাড়া আর কিছুই হয়নি। পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে খুলনার মূল শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে ফুলতলার মশিয়ালীতে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে খুলনা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে বিল ডাকাতিয়ার তেলিগাতিতে স্থান নির্ধারণ ও জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সেই অধিগ্রহণ বাতিল করে আশির দশকে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালীতে স্থান নির্ধারণ করা হয়।

কুমিল্লা প্রতিবেদক দুলাল মিয়া জানান, সেখানকার পরিত্যক্ত রানওয়েতে জন্মেছে ঘাস ও লতাপাতা। সীমান ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন ও গরুর খামার। ৭৭ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত বিমানবন্দরটিতে ১৯৯৪ সালে নতুন করে ফ্লাইট ওঠানামা করলেও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন আহাম্মদ জানান, তাদের ডিভিওআর, ডিএমই ও ভিস্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ৩০টির মতো উড়োজাহাজ প্রতিদিন নেভিগেশন সেবা নিচ্ছে। এ থেকে বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় হচ্ছে।

বগুড়া থেকে সাখাওয়াত হোসেন জনি জানান, বগুড়া বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরুর আশায় বুক বেঁধে আছেন উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীরা। এই অঞ্চল থেকে তেল, পাটজাত পণ্য ও মাথার জালি টুপিসহ বিভিন্ন সামগ্রী দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, ‘বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও এ অঞ্চলে আমন্ত্রণ জানানো যাবে।’

ঈশ্বরদী (পাবনা) থেকে মহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৬২ সালে ৪৩৬.৬৫ একর জায়গার ওপর ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু হয়। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সেখান থেকে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হতো। এরপর ২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করলেও পরের বছরই বন্ধ হয়ে যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বিমানবন্দরটি আবার সচল করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

ঠাকুরগাঁও থেকে ফিরোজ আমিন সরকার জানান, ১৯৮০ সাল থেকে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর অচল। বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এটি আর সচল হয়নি। ঢাকা থেকে চারশ কিলোমিটার দূরের এই বিমানবন্দরটি দ্রুত সময়ের মধ্যে চালু করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

বাগেরহাট প্রতিবেদক অলীপ ঘটক জানান, খানজাহান আলী বিমানবন্দর চালু হলে সুন্দরবনে পর্যটক বেড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মোংলা ইপিজেডের গতিশীলতা বাড়বে। বিমানবন্দরটির জন্য ৪১.৩০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাট করা হলেও পরে আর অগ্রগতি হয়নি। মোংলা বন্দর কর্র্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মাকরুজ্জামান বলেন, বিমানবন্দরটি চালু করা হলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শেখ শাহেদ আলী রবি ও ব্যবসায়ী এটিএম আকরাম হোসেন তালিমও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত।

রানওয়ে করতে যা লাগবে : সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলোর বেশিরভাগের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ফুটের মধ্যে। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পাকিস্তান আমলের হালকা বিমানের উপযোগী ছিল। বর্তমানে এটিআর বা ড্যাশ-৮ বিমান ওঠানামার জন্য ন্যূনতম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার ফুট রানওয়ে প্রয়োজন। ফলে রানওয়ে সম্প্রসারণ করতে হলে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। আবার এয়ারপোর্টের জন্য আধুনিক ডিভিওআর, আইএলএস এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারও থাকতে হবে। এসব না থাকলে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকার অনুমোদন পাওয়া সম্ভব নয়। 

বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত : পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো সচল করতে সম্প্রতি বেবিচকের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংস্থার সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আটটি বিমানবন্দর সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনার জন্য উপযোগী কিনা সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। পরে একটি প্রস্তাব বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে অনুমোদন সাপেক্ষে সচলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

দখল হয়ে যাচ্ছে জায়গা : বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের জায়গা প্রভাবশালী মহল বা ব্যক্তি দখল করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেউ কেউ বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। তাদের উচ্ছেদ করতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে আরও চাঙা করতে সরকার বিমানবন্দরগুলো আবার চালু করতে চায়। আমরা বাজেট নিয়ে কাজ করছি। প্রথমে বগুড়া বিমানবন্দরের কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে লম্বা সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে।’

ুবেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো আবার চালু করার চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রথমে প্রাধান্য দিচ্ছি বগুড়া বিমানবন্দরকে। সেটি কী অবস্থায় আছে, তা পর্যালোচনা করতে সরেজমিনে গিয়েছি। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরটির সংস্কার শুরু করতে পারব।’