চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর টানা দুই দিন মার্কিন হামলা সত্ত্বেও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ওয়াশিংটন। একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশের টেকনিক্যাল বা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া ও যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাত থেকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পর্যন্ত দুই পক্ষই বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়ালে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা তিন সপ্তাহের পুরোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
মার্কিন সূত্র মতে, পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান সমর্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হামলা চালালে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। ইরানের অনুমোদিত রুট বা পথ ব্যবহার না করায় জাহাজগুলোর ওপর ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর জবাবে মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে ইরানের ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে প্রথম হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
এর পরদিন বুধবার উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এর জের ধরে বুধবার রাতে এবং বৃহস্পতিবার আবারও ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ইরানের দাবি, এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সম্ভবত ‘শেষ’। ফলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানি নেতৃত্বকে ‘নর্দমার কীট’ বলে অভিহিত করেন এবং চলমান শান্তি আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে মন্তব্য করলেও আপাতত তা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।
তবে বৃহস্পতিবার সুর কিছুটা নরম করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্টদের জন্য নির্ধারিত বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ থাকা সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। সামরিক বিকল্পের কথা মাথায় থাকলেও তেহরান আসলে একটি ‘চুক্তি করতে চায়’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোরে ইরানের বুশেহরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকাসহ কোনারাক, চোগাদাক ও বন্দর আব্বাসের মতো দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি এলাকায় দফায় দফায় বিস্ফোরণের খবর দেয় ইরানি গণমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এসব বিস্ফোরণে তাদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। শুক্রবার সকালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো আবারও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। দুই পক্ষের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা না দিলেও একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, এই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি হয় ইরান। বিপরীতে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করতে পারবে এবং তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, ইরানের ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত হওয়া অর্থ ফেরত, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো নিয়ে সুইজারল্যান্ডে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ দখল করে সেখানে অনবরত বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়ায় আলোচনা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে সুইজারল্যান্ডে কিছু প্রত্যক্ষ আলোচনার পর চলতি মাসের শুরু থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় পরোক্ষভাবে ‘কারিগরি’ আলোচনা শুরু হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের কারণে আলোচনা সাময়িক স্থগিত করা হয়। এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালীন কোনো হামলা চালানো হবে না বলে ট্রাম্পও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
১১ জুলাই খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এই আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার ভোরে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সর্বোচ্চ নেতাকে তার জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করার মধ্য দিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিয়ম চলাকালীনই যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয়বারের মতো ইরানে হামলা চালানোয় এই আলোচনা আদৌ শুরু হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক নেতারা এই সপ্তাহের মার্কিন হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির এক নম্বর ও পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। এই বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেছে তেহরান।
ইরানের অন্যতম প্রধান আলোচক ও দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘দাদাগিরি’র মানসিকতা নিয়ে সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘আমেরিকা এখনো বোঝেনি যে দাদাগিরি করা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিন শেষ। সহজ কথায়: আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পেতেই হবে।’
অবশ্য এমন বৈরি পরিস্থিতির মধ্যেও আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট-এর সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাতানকা আল জাজিরাকে বলেন, কূটনীতি মানেই শান্তি নয়। তেহরানের বর্তমান আলোচনাটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথা বলা বা না বলা নিয়ে নয়; বরং তারা দেখতে চাচ্ছে আলোচনার পাশাপাশি সীমিত আকারে সামরিক চাপ বজায় রাখা যায় কি না। এই মুহূর্তে তেহরান বা ওয়াশিংটন কেউই পুরোদমে নতুন কোনো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) যা ছিল:
- ইরানে যুদ্ধবিরতি: যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা ও সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত।
- লেবাননে যুদ্ধবিরতি: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং লেবাননের অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। (যদিও চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ইসরায়েল সেখানে হামলা চালিয়েছে)।
- হরমুজ প্রণালি: মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের পক্ষ থেকে জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা।
- পারমাণবিক অস্ত্র: ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না।
- নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালিয়ে এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব বন্ধ না করে চুক্তি ভঙ্গ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির দুটি রেলসেতু ও উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে বর্ণনা করেছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে ইরান। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকেই ওই রুটে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা হয়েছে। গত সোমবার রাতে ওমান উপকূলে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আগুন ধরে যায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' জানায়, সোমবার রাতে আইআরজিসি দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে মিসাইল ছুড়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইরানের ‘পরিবেশ বা সার্ভিস চার্জ’ আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মহসেন মিলানি বলেন, ‘ওমানের সঙ্গে মিলে এই ফি আদায়ের মাধ্যমে প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বকে স্থায়ী প্রভাবে রূপান্তর করতে চায় ইরান।’ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মার্কিন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাইকেল ওয়াহিদ হান্না মনে করেন, ইরান যুদ্ধ শেষে প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও সেখান থেকে অর্থ উপার্জনের যে কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, তা এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা স্মারকের ভাষা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং এর প্রতিটি পয়েন্টের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে, যা মূলত এই বিরোধের প্রধান কারণ।
এমওইউ-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য পার্সিয়ান উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিনামূল্যে ও নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। আইআরজিসি কর্তৃক ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ ও প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার পর এই চলাচল শুরু হবে। এছাড়া প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পরিষেবা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ওমান এবং পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আইআরজিসি-এর নির্ধারিত রুট বা পথ না মানায় যে জাহাজগুলোর ওপর ইরান হামলা চালিয়েছে, তা এই ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
উল্লেখ্য, মার্চ মাসের শুরুতে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলেও এপ্রিল মাসে একটি ম্যাপ বা মানচিত্র প্রকাশ করে নির্দিষ্ট কিছু রুট দিয়ে অনুমোদিত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অনেক জাহাজ ইরানের সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করে ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত পুরোনো রুট ব্যবহার করতে শুরু করে, যা ইরানের মানচিত্রে ‘নিষিদ্ধ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
সূত্র: আল-জাজিরা