আল মাহমুদের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যের বয়ান

বাংলা সাহিত্যে ইসলামি ঐতিহ্যের ব্যবহার নতুন নয়। মধ্যযুগের কবিরা ধর্মীয় ইতিহাস, কুরআনের কাহিনি ও নবীদের জীবন থেকে নানা উপাদান গ্রহণ করেছেন। আধুনিক যুগে কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদের পর আল মাহমুদ সেই ধারাকে নতুন শিল্পভাষা ও আধুনিক কাব্যবোধে সমৃদ্ধ করেন।

আল মাহমুদের কবিতা বৈচিত্র্যময়। তার কবিতায় নদী আছে, মাটি আছে, আছে বাংলার লোকজ জীবন। পাশাপাশি আছে কুরআনের কথা, নবীদের কাহিনি, ইসলামি ইতিহাস, সুফি ভাবধারা এবং স্রষ্টার প্রতি গভীর আত্মসমর্পণের ভাষা। ফলে তার কবিতা কেবল নান্দনিকতার নয়, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যেরও এক উজ্জ্বল দলিল। তিনি ইসলামি ঐতিহ্যকে নিছক অতীত হিসেবে দেখেননি। বরং বর্তমানের জীবন, সংকট ও মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে সেটাকে যুক্ত করেছেন।

আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’এ প্রথম ইসলামি ঐতিহ্যের প্রকাশ দেখা যায়। ‘অন্ধকারে একদিন’ কবিতায় তিনি আদম ও হাওয়ার জান্নাতবাস, নিষিদ্ধ ফল এবং মানবজাতির পৃথিবীতে অবতরণের কাহিনিকে নতুন কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন।

একই কাব্যগ্রন্থের ‘নুহের প্রার্থনা’ কবিতায় উঠে এসেছে মহাপ্লাবনের ঘটনা। চারদিকে জলরাশি। ভাসছে নুহ (আ.) এর নৌকা। নতুন পৃথিবীর অপেক্ষায় মানুষ প্রার্থনা করছে, যেন সেই আগের অবাধ্যতার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে। এখানে ইসলামি ইতিহাস মানবজাতির আত্মশুদ্ধির প্রতীক হয়ে ধরা দেয়।

তবে আল মাহমুদের ইসলামি ঐতিহ্য চর্চার পূর্ণ বিকাশ ঘটে তার দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতায়। বিশেষ করে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থে। এ সময় তিনি কুরআন, বাইবেল ও ইসলামি ইতিহাসকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেন।

তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাবাসের সময় কুরআনসহ বিভিন্ন ঐশী গ্রন্থ অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তার সৌন্দর্যবোধ ও কাব্যদর্শনে মৌলিক পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় তার কবিতায়। ‘প্রাচীর থেকে কথা’ কবিতায় ইউসুফ (আ.) এর কারাবাস ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক ঘটনাকে সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন। অতীতের ইতিহাস এখানে বর্তমানের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন, যদিও বোঝে না কবি রাজাদের স্বপ্নের কী মানে/ কিন্তু এটা তো জানে, হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।

কবিতার এই চরণ দুটিতে প্রাচীন মিথ বা ইতিহাসের আড়ালে সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার এক অমোঘ পরিণতিকে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে স্বপ্ন ও বাস্তবতার পার্থক্যের ভেতর দিয়ে শাসকের নিষ্ঠুরতা এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রথম লাইনে কবি সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যেমন রাজার স্বপ্নের নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা বুঝতে পারতেন, সাধারণ মানুষ বা কবির পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শাসকদের গোপন পরিকল্পনা বা তাদের উচ্চাকাক্সক্ষার সেই স্বপ্নের ভাষা বোঝা সবসময় সম্ভব হয় না। শাসকদের মনের গহিনে কী ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনা চলছে, তা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

দ্বিতীয় লাইনে এসে কবি তার নিজস্ব প্রজ্ঞা ও ঐতিহাসিক জ্ঞান থেকে এক চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি হয়তো ঐশী ক্ষমতাবলে রাজার স্বপ্নের অর্থ করতে পারেন না, কিন্তু অতীত ইতিহাস ও মানবিক বোধ থেকে তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে অবিচার ও হত্যার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড বা রাজনৈতিক নিপীড়ন কেবল আরেকটি পাল্টা সহিংসতার জন্ম দেয়। রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা যে শেষ পর্যন্ত আরও বড় বিদ্রোহ ও রক্তপাতের দিকেই সমাজকে ঠেলে দেয়, কবি সেই অমোঘ সত্যটিকেই এখানে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থাৎ ক্ষমতার অন্ধ মোহে শাসকরা যাই পরিকল্পনা করুক না কেন, হত্যার রাজনীতি যে কেবল ধ্বংসেরই পথ প্রশস্ত করে এবং সহিংসতার চক্র তৈরি করে, এটিই এই পঙ্ক্তিগুলোর মূল নির্যাস।

‘ধাতুর ওলান থেকে’ কবিতায় মুসা (আ.) এর তুর পাহাড়ে অবস্থান এবং তার অনুপস্থিতিতে বনি ইসরাইলের বাছুরপূজার ঘটনা নতুন অর্থে ফিরে আসে। কবি দেখান, মানুষ যুগে যুগে সত্যের আহ্বান ভুলে ভ্রান্তির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু ঐশী বাণীর ডাক কখনো থেমে থাকে না। সেই আহ্বান আজও বিবেককে নাড়া দেয়। একই কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’তে কবি অন্যায়ের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের কুরআনিক বর্ণনাকে বর্তমান সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, অবিচার ও জুলুম কোনো সভ্যতাকেই স্থায়ী হতে দেয় না। ইতিহাস বারবার সেই একই শিক্ষা দেয়।

আল মাহমুদের ইসলামি বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ পাওয়া যায় ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ কাব্যগ্রন্থের ‘হযরত মুহম্মদ’ কবিতায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং মানবমুক্তির আলোকবর্তিকা। লাত, মানাতসহ মূর্তিপূজার অন্ধকার ভেঙে তার হাত ধরেই মানবসভ্যতায় সত্য, ন্যায় ও ইমানের নতুন ভোরের সূচনা ঘটে। কবি গভীর শ্রদ্ধা, আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে সেই ইতিহাসকে কাব্যে ধারণ করেছেন।

দ্বিতীয় পর্ব থেকেই আল মাহমুদের কবিতায় সুফি ভাবধারার উন্মেষ ঘটে। তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্যে স্রষ্টার নিদর্শন খুঁজে পান। ‘আলো নিরাকার’ কবিতায় বিশ্বজগতের প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি নক্ষত্র, প্রতিটি ঋতুচক্রের পেছনে তিনি অনুভব করেন মহান স্রষ্টার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। আর ‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’ কবিতায় এক বিনীত বান্দার মতো নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে আল্লাহর ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করেন।

তৃতীয় পর্বে এসে এই আধ্যাত্মিক অনুভব আরও গভীর ও পরিণত হয়। ‘ভরহীন’, ‘প্রার্থনার ভাষা’, ‘বিরামপুরের যাত্রী’ কিংবা ‘অনামাঙ্কিত হৃদয়’ কবিতাগুলোতে মৃত্যুচেতনা, আত্মসমর্পণ, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। এখানে কবি পার্থিব জীবনের মোহ অতিক্রম করে অনন্ত জীবনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন।

‘নদীর ভিতরে নদী’ কাব্যগ্রন্থের ‘পুনরুত্থানের ফুৎকার’ কবিতায় কেয়ামত, ইসরাফিল (আ.) এর শিঙ্গা, কবর থেকে মানুষের পুনরুত্থান এবং হাশরের ময়দানের দৃশ্য শক্তিশালী কাব্যভাষায় রূপ পেয়েছে। কুরআনে বর্ণিত পরকালীন বিশ্বাসকে তিনি এমনভাবে শিল্পে রূপ দিয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি ও কাব্যিক কল্পনা একাকার হয়ে গেছে।

‘স্মৃতির মেঘলা ভোর’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ বা অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

আল মাহমুদ এমন এক মৃত্যুর কল্পনা করেছেন, যা আসবে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার পুণ্যলগ্নে। একজন মুমিনের কাছে মৃত্যু হলো স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার মাধ্যম। তাই অপ্রস্তুত অবস্থায়, সংসারের চেনা আলো আঁধারির মাঝে হঠাৎ যদি ডাক চলেও আসে, তিনি তাকে ভয় বা আক্ষেপের বদলে ঈদের মতো আনন্দ ও পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির সঙ্গে বরণ করে নিতে চেয়েছেন।

এই পঙ্ক্তিগুলোতে পার্থিব মোহমুক্ত এক পরম সমর্পিত আত্মার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, যিনি প্রভুর যেকোনো সিদ্ধান্তকে হাসিমুখে মেনে নিতে প্রস্তুত। জুমার দিনটি অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ। এই দিনে বা এর আগের রাতে কোনো মুসলিমের মৃত্যু হলে তাকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যেকোনো মুসলিম শুক্রবার দিনে বা শুক্রবার রাতে মারা যায়, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তাকে কবরের ফেতনা বা পরীক্ষা থেকে রক্ষা করেন। (জামে তিরমিজি)

এই হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, জুমার দিনে মৃত্যু হওয়াটা সৌভাগ্যের লক্ষণ এবং এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের একটি নিদর্শন। কবির আকুলতা মূলত এই ঐশী অনুগ্রহ ও কবরের প্রশান্তি লাভের গভীর প্রত্যাশা থেকেই উৎসারিত।

আল মাহমুদের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য তারই জীবন দর্শনের অংশ, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি এবং কাব্যসৃষ্টির অন্যতম উৎস। আদম (আ.) থেকে নুহ (আ.), মুসা (আ.) থেকে ইউসুফ (আ.), মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে কেয়ামত ও পরকালের বিশ্বাস, সবকিছুই তার কবিতায় নতুন শিল্পরূপ লাভ করেছে। একই সঙ্গে সুফি ভাবনা, আত্মসমর্পণ, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং স্রষ্টাপ্রেম তার কাব্যকে দিয়েছে অনন্য আধ্যাত্মিক মাত্রা।