বইচিত্র

বাইনারির বাইরে গিয়ে পাঠপ্রচেষ্টা

রাফাত আলমের বাংলাদেশের উপন্যাসে সাতচল্লিশের রাজনীতি গ্রন্থটি বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত ও সনাতন সমালোচনা পদ্ধতির এক বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করে। এখানে বাংলাদেশের নির্বাচিত কিছু উপন্যাসকে ইতিহাস, সমাজ ও ক্ষমতার জটিল সম্পর্কের ভেতর স্থাপন করে পাঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বইটির বিষয় নির্বাচন, বিশ্লেষণের পদ্ধতি এমনকি আঙ্গিকগত নির্মাণেও এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান কার্যকর রয়েছে। এতে ‘রাজনীতি’ শব্দটি বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। জনজীবন, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রতিটি স্তরেই ক্ষমতা-সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। আর যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের সম্পর্ক কাজ করে; রাজনীতির উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে সেখানেই। লেখক সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত হলেও, লেখকের কুশলতায় মিলেমিশে একাকার হয়েছে। গ্রন্থটিতে গবেষণার জন্য মূলত দুটি পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়েছে—নব্য ইতিহাসবাদী সমালোচনা এবং পাঠ-নির্ভর বিশ্লেষণমূলক সমালোচনা। এগুলোর পাশাপাশি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে রাজনৈতিক চিন্তার প্রকৃতি ও বিবর্তন অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

গ্রন্থটি তিনটি অংশে বিভক্ত ছয়টি অধ্যায়ের মাধ্যমে সুসংবদ্ধভাবে উপস্থাপিত হয়েছে—প্রথম অংশে একটি, দ্বিতীয় অংশে চারটি এবং তৃতীয় অংশে একটি অধ্যায়। অধ্যায়গুলোর নামকরণে বিশেষ কুশলতা ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন ‘বিশ্বযুদ্ধ-মন্বন্তর ও জনমানুষ’, ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন’, ‘দেশভাগ’, এবং ‘সাতচল্লিশ-পরবর্তী আর্থরাজনৈতিক জিজ্ঞাসা ও ভাষা আন্দোলন’—এসব শিরোনাম ইতিহাসের অন্তর্লীন অভিজ্ঞতা ও জনমানুষের চেতনাকে ধারণ করে। গ্রন্থটিতে লেখক দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থাকা বয়ানকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করে একটি বহুস্বরিক ইতিহাস-আখ্যান নির্মাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। অধ্যায়গুলোর নামকরণের মধ্যেই সেই বহুস্বর, পুনর্নিমাণের আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে পাঠ করার প্রয়াস স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৪৭ সালকে কেবল ‘দেশভাগ’-এর ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালেই থেকে যায়। পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে এটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছিল। বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীর বড় অংশ পাকিস্তান আন্দোলনকে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম হিসেবে দেখেছিল। তাই ‘দেশভাগ’ শব্দটি মূলত একটি রাজনৈতিক নির্মাণ, যার অর্থ ও ব্যাখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। সাতচল্লিশ-পরবর্তী সাহিত্য, স্মৃতিকথা ও সংবাদপত্রে ঘটনাটি স্বাধীনতা ও নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনন্দময় পর্ব হিসেবে প্রতিভাত হয়। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় তখন ‘মুক্তি’ ও ‘অর্জন’-এর অনুভূতিই প্রবল ছিল। কিন্তু ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সাতচল্লিশের ঘটনাকে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, যেখানে ‘দেশভাগ’ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। রাফাত আলমের গ্রন্থটি বাংলাদেশের উপন্যাসে ১৯৪৭-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের শিল্পরূপ ও তার বহুমাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক প্রয়াস। এখানে সাতচল্লিশ এবং তার অব্যবহিত পরবর্তী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে ধারাবাহিক রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা পূর্ববাংলার সাহিত্যচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা স্পষ্টতই তাদের সৃষ্টিতে এই সময়পর্বের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। বিশেষত পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রচিত উপন্যাসসমূহে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনজীবনের রাজনৈতিক চেতনা অত্যন্ত জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পরবর্তী সময়েও বহু ঔপন্যাসিক এই ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমকে ভিত্তি করে উপন্যাস রচনা করেছেন। ফলে এই বিষয়ের উপস্থাপনায় দৃষ্টিভঙ্গিগত বৈচিত্র্য ও গভীরতা তৈরি হয়েছে। গ্রন্থটিতে দেখানো হয়েছে, ১৯৪৭-পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও রূপান্তর ১৯৫২ সালে নতুন মাত্রা লাভ করে, তবে এই দুই ঘটনা পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়; একই ধারাবাহিক ইতিহাস-চেতনার অংশ। তাই এই সময়ের জনমানুষের রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ বোঝার জন্য উপন্যাসপাঠ একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। 

এ গ্রন্থে আরও দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের উপন্যাসে সাতচল্লিশ-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আত্মসত্তা-অন্বেষণের অংশ হিসেবে বিকশিত হয়েছে। এই স্বতন্ত্র বয়ান গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী ইতিহাস-আখ্যানের ছায়া থাকলেও তা একমাত্রিকতাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর প্রবাহের দিকে অগ্রসর হয়। এখানকার ঔপন্যাসিকরা প্রায়শই নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা না নিয়ে সুযোগ পেলে নিজেরাই একটি রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠেছেন, ফলে বহু উপন্যাস আত্মজৈবনিকতায় মোড়ানো। লেখকদের শ্রেণি, ভৌগোলিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কখনো চরিত্রের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সমষ্টিগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। লেখক এ পরিবর্তন ধরতে পেরেছেন সফলভাবে। গ্রন্থটিতে আরও দেখা যায়, উপন্যাসে কেবল ঘটনার পুনর্নির্মাণ নয়, ‘হতে পারত’ ইতিহাসের কল্পনাও কার্যকর। যা ঘটেছে তার বিকল্প সম্ভাবনা অনুসন্ধানের এই প্রবণতা বাংলাদেশের উপন্যাসে সাতচল্লিশের রাজনীতিকে একটি সামূহিক ও গতিশীল মাত্রা প্রদান করেছে।

মৌলিক চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি মননশীল পাঠককে আলোড়িত-আলোকিত করবে। সাহিত্য ও রাজনীতির অজস্র অনুষঙ্গ ছাড়িয়ে গ্রন্থটি উৎসাহী পাঠকের চিন্তার বাঁধাছক ভাঙতে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।