এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বার্সেলোনার অতি-নির্ভরশীলতা বোঝাতে একটি শব্দের উৎপত্তি হয়েছিল—'মেসি-ডিপেনডেনসিয়া'। ৩৯ বছর বয়সে, ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসেও যেন সেই একই বৃত্তে বন্দি আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি একাই অবিশ্বাস্য ফুটবল উপহার দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হলে বাকি ১০ জন খেলোয়াড়কে শুধু পার্শ্বচর হয়ে থাকলে চলবে না, তাদেরও নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
কোয়ার্টার ফাইনালে যেখানে মেসি বনাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক মহানাটকীয় দ্বৈরথের সম্ভাবনা জেগেছিল, সেখানে আর্জেন্টিনার সামনে এখন সুইজারল্যান্ড। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। পর্তুগালের বাকি ১০ জন খেলোয়াড় হয়তো বিশ্বকাপ জেতার মতো যোগ্য ছিলেন, কিন্তু রোনালদো ছিলেন না। বুড়ো তারকার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করার নীতি সেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্পটা ভিন্ন। এখানে মেসি বুড়ো হলেও তার ধার কমেনি, বরং কমেছে তার সতীর্থদের ধার। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার করা ১৪টি গোলের মধ্যে ৮টি গোলই এসেছে মেসির পা থেকে। বাকি ৬টি গোলের মধ্যে ২টি এসেছে জর্ডানের বিপক্ষে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন ম্যাচে, যখন মেসি মাঠেই ছিলেন না। মেসি যখন মাঠে ছিলেন, তখন বাকি ৪টি গোলের মধ্যে একটিতে ছিল তার সরাসরি অ্যাসিস্ট (মিশরের বিরুদ্ধে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোল)। এমনকি কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে জয়সূচক আত্মঘাতী গোলটিও এসেছিল মেসির নেওয়া কর্নার কিক থেকেই।
আর্জেন্টিনার গোল বিশ্লেষণ (মোট ১৪ গোল)
- মেসির নিজস্ব গোল: ৮টি (৫৭%)
- মেসিবিহীন ম্যাচে গোল: ২টি
- মেসির অ্যাসিস্ট/অবদান: ২টি
- দলের বাকিরা: মাত্র ২ গোল!
অফিসিয়ালি এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার হয়ে একাধিক গোল করতে পারেননি মেসির কোনো সতীর্থ। কোচ লিওনেল স্কালোনি যদিও দাবি করেছেন, 'এটি এমন কিছু নয় যা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। আমি চাই গোলগুলো সবার মধ্যে ভাগ হয়ে আসুক।' তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মেসির এই একক লড়াই চার দশক আগের ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা একাই ৫টি গোল করেছিলেন এবং ৫টি গোল করিয়েছিলেন। তৎকালীন স্কোয়াডের বাকি ১০ জন হয়তো ম্যারাডোনাকে ছাড়া কিছুই ছিলেন না, কিন্তু ফাইনালে যখন বড় পরীক্ষার সময় এলো, তখন হোসে লুইস ব্রাউন, হোর্হে ভালদানো বা হোর্হে বুরুচাগারাই গোল করে ম্যারাডোনার স্বপ্ন সফল করেছিলেন।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলটির সাথে এই দলের অদ্ভুত মিল রয়েছে। কাতার স্কোয়াডের ১৬ জন খেলোয়াড় এখনো দলে আছেন এবং মূল একাদশের ৮ থেকে ৯ জনই অপরিবর্তিত। কিন্তু সবচেয়ে বড় খামতিটা তৈরি হয়েছে আনহেল ডি মারিয়ার অবসরে। ২০২২ ফাইনালের সেই ত্রাতা ডি মারিয়ার কোনো যোগ্য বিকল্প এখনো তৈরি করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
কাতার বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জিতলেও আর্জেন্টিনার একটা দাপট ছিল। কিন্তু এবার কেপ ভার্দে বা মিশরের মতো কম শক্তির দলগুলোর বিরুদ্ধেও আর্জেন্টিনাকে ধুঁকতে হয়েছে। প্রতিপক্ষের তুলনায় আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের শারীরিকভাবে বেশ ধীরগতির মনে হচ্ছে, কাউন্টার অ্যাটাকে সহজেই পরাস্ত হচ্ছে ডিফেন্স। মেসিকে কেন্দ্র করে মাঠের মাঝখানে অতিরিক্ত খেলোয়াড় জটলা করায় উইং বা ফ্ল্যাংকগুলো ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো বা লিসান্দ্রো মার্টিনেজ আক্রমণে গিয়ে গোল করলেও রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মিশরের দুটি গোলের ক্ষেত্রেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার লিসান্দ্রোর পজিশনিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লিওনেল মেসি ছাড়া এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে এমন কোনো খেলোয়াড় নেই যাকে বিশ্বের সেরা বলা যায়। হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্তিনেস বিশ্বমানের হলেও হ্যারি কেইন, আর্লিং হালান্ড কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের সমকক্ষ নন। ২০০২ বা ২০০৬ সালের আর্জেন্টিনা দলেও হয়তো এর চেয়ে বেশি প্রতিভার ছড়াছড়ি ছিল।
বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটি সফল, কারণ তাদের একজন মেসি আছেন। কিন্তু প্রতি ম্যাচের সাথে সাথে মেসির কাঁধের বোঝা কেবল ভারীই হচ্ছে। আর্জেন্টিনাকে যদি সেমিফাইনালে যেতে হয়, তবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সতীর্থদের এগিয়ে আসতে হবে। মিশরের বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করা মেসির ওপর থেকে অন্তত স্পট-কিকের দায়িত্বটা সরিয়ে নিয়ে হলেও কি একটু চাপ কমাবে বাকি ১০ জন?