প্রচ্ছদ রচনা

বাংলা ভাষাচর্চার মূলধারা ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ‘ভিন্নমত’

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৮৮৫-১৯৬৯) যে সময়টাতে ভাষাচর্চা করছিলেন, সে সময়ে বাংলা ভাষাচর্চার সাধারণ ভূগোলটা একবার দেখে নেওয়া যাক। তার ভাষাচর্চার কাল মূলত বিশ শতকের বিশের দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত। উনিশ শতকে বাংলা ভাষাচর্চা হয়েছে প্রধানত ‘প্রথাগত’ ব্যাকরণ আর অভিধানের এলাকায়। এ সময় অসংখ্য ব্যাকরণ রচিত হয়েছে। ব্যাকরণগুলোর লক্ষ্য ছিল মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণ, বিশেষত মুগ্ধবোধ, অনুসারে বাংলা ব্যাকরণের গ্রহণযোগ্য রূপ প্রণয়ন করা। প্রকাশিত অভিধানের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষিক অভিধান ছাড়াও বেরিয়েছিল অসংখ্য সংস্কৃত শব্দের অভিধান, যাতে করে নতুন আমদানিকৃত বা ইতিমধ্যে প্রচলিত সংস্কৃত শব্দের ‘শুদ্ধ’ ব্যবহারবিধি রপ্ত করে নেওয়া যায় আর বেরিয়েছিল অনেক আরবি-ফারসি শব্দের অভিধান, যাতে বাংলায় প্রচলিত এ ধরনের শব্দগুলো চিনে নিয়ে তা বাদ দেওয়া যায়।

বাংলা গদ্য-ব্যাকরণ-অভিধানের এই ধারার চর্চার প্রবল প্রতাপের মধ্যে শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় শুরু করেন এক নতুন ধারার ভাষাচর্চা। অনতিপরে এ ধারায় আবির্ভূত হন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ। এঁদের চর্চার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষার স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন। পরবর্তীকালে যাকে বর্ণনামূলক ব্যাকরণ বা বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান বলা হয়েছে, এঁদের প্রত্যেকের চর্চায় তার সুস্পষ্ট লক্ষণ ছিল। ১৮৯৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হলে এ ধারার ভাষাচর্চা কার্যকর সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে। বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের কর্মযজ্ঞ আর বেশ কিছু সভার কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, অল্পসংখ্যক নতুন চর্চাকারীর স্বর সেসময়ে প্রভাবশালী স্বরকে চাপা দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। বিশ শতকের প্রথম দশকের পর এ স্বর নিস্তেজ হয়ে আসে।

বাংলা ভাষাচর্চার পরবর্তী ধারা মূলত তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ধারায় বিকাশলাভ করে। বীম্‌স, হর্নলে, গ্রিয়ার্সন প্রমুখ এ ধারার সূচনা করেন উনিশ শতকের শেষাংশে। বিশ শতকের বিশের দশক থেকে এ ধারায় ব্যাপকভাবে নিয়োজিত হন বিজয়চন্দ্র মজুমদার, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুকুমার সেন প্রমুখ। শহীদুল্লাহ্‌র জীবদ্দশায় বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চাও শুরু হয়েছিল। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছিলেন বলে মনে হয় না।

দেখা যাচ্ছে, সেকালে বাংলা ভাষাচর্চার মূলধারার বৈশিষ্ট্য মোটামুটি দুটি। পদ্ধতির দিক থেকে তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতি আর উপাদানের দিক থেকে সংস্কৃতের সাপেক্ষে বা সাহায্যে বাংলা ভাষার বিশ্লেষণ। এ অবস্থার প্রতি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র কোনো বিরাগ ছিল না। থাকার কোনো কারণও নাই। তিনি এ ধারারই মানুষ ছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা কেবল তার ব্যক্তিগত পক্ষপাতের নয়। যে বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি, সে বিষয়ের সঙ্গেও সমকালীন ওই ভাষাচর্চার কোনো বিরোধ ছিল না। তিনি ‘শব্দবিদ্যায় নিপুণ ছিলেন’। অনেক ভাষা জানতেন বলে তুলনামূলক আলোচনা তার জন্য অনেক সহজ ছিল। মুহম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন : ‘সংস্কৃত ভাষায় এবং প্রাচীন কথ্য আর্য ভাষা থেকে উদ্ভূত তার পরবর্তী স্তরের পালি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ প্রভৃতি ভাষায় শহীদুল্লাহ্‌ সাহেবের বিশেষ জ্ঞান থাকায় এ উপমহাদেশের আর্যভাষা গোষ্ঠীর যেকোনো ভাষার ইতিহাসভিত্তিক ভাষা বিজ্ঞানের চর্চাও তার পক্ষে অত্যন্ত সহজ হয়েছে। যেকোনো শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে এই উপমহাদেশে তার জুড়ি মেলা ভার।’ তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা একই ইঙ্গিত দেয়। পড়েছেন কমপক্ষে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সর্বত্রই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সেকালের অত্যন্ত প্রভাবশালী তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাশাস্ত্রে। তার চর্চায়ও এর খুব বেশি ব্যতিক্রম নেই।

কিন্তু বাংলা ভাষা-সম্পর্কিত তার বেশ কিছু মতামত আর সিদ্ধান্ত একজন ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কুলজি-ঠিকুজির তত্ত্ব-তালাশে তার ভিন্নমত বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়। এখানে এ রকম দুটি এলাকার উল্লেখ করা হলো।

এক. বাংলা ভাষার উৎপত্তি-সম্পর্কিত মত
দীর্ঘদিন ধরে রচিত ইংরেজি-বাংলা প্রবন্ধের সার-সংকলন করে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রকাশ করেন তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত। এ বইতে তিনি খুব নিরীহ ভঙ্গিতে গুরুতর সব সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। এর মধ্যে বাংলা ভাষার উৎপত্তি-সম্পর্কিত মত সবচেয়ে বিখ্যাত।

প্রথমে তিনি পূর্ববর্তী মতগুলোর পর্যালোচনা করেছেন। শুরু করেছেন ‘বাঙ্গলা সংস্কৃতের দুহিতা’—এই মতের পর্যালোচনা দিয়ে। তার মতে, সংস্কৃত হতে বাংলা জন্মেছে, এই মত কেউ পোষণ করতে পারে না। কারণ, বাংলার আগে অপভ্রংশ ও প্রাকৃত ছিল। সংস্কৃত প্রাকৃত যুগের একটি সাহিত্যিক ভাষা। তাই সংস্কৃত যুগ বলে ভারতীয় আর্যভাষার কোনো যুগ কল্পনা করা যায় না। কয়েকটি উদাহরণ পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন, ‘বাঙ্গালা সংস্কৃতের দুহিতা নহে, তবে দূরসম্পর্কীয়া আত্মীয়া বটে’।

এরপর তিনি মাগধী প্রাকৃতের সঙ্গে বাংলা সম্পর্ক পর্যালোচনা করেছেন। মাগধী প্রাকৃত থেকে মাগধী অপভ্রংশ হয়ে বাংলার উৎপত্তি হয়েছে—এ মত যারা পোষণ করেন, তাদের দুটি যুক্তি খণ্ডন করেছেন শহীদুল্লাহ্। বাংলায় শ, ষ, স—এ তিনটির উচ্চারণ একই—শ। মাগধীতেও তাই। মাগধীতে আবার ‘র’ স্থানে ‘ল’ হয়। শহীদুল্লাহ্ বলছেন, বাংলা কিংবা এর সহোদরা ভাষা আসামি, উড়িয়া, বিহারিতে এই শেষোক্ত বৈশিষ্ট্য নাই। আবার বাংলার ‘শ’-কারত্ব মাগধী থেকে ধারাবাহিকভাবে আসেনি। সংশ্লিষ্ট কথ্য অপভ্রংশে এ বৈশিষ্ট্য ছিল না। থাকলে বাংলার সহোদরা ভাষাগুলোতেও তা পাওয়া যেত। কিন্তু ‘উড়িয়া এবং বিহারীতে স-কার এবং আসামীতে হ-কার দৃষ্ট হয়’। এমনকি বাংলার পশ্চিমাংশে এখনো স-কার প্রচলিত আছে। সুতরাং তার সিদ্ধান্ত, ‘বাংলা ভাষার শ-কারত্ব অনেক পরবর্তী যুগের স্বতঃউৎপাদিত’।
যারা বলেন মাগধী থেকে বাংলার উৎপত্তি হয়েছে, তাদের আরেকটি যুক্তি হলো : মাগধী প্রাকৃতে কর্তায় ‘এ’-কার হয়, বাংলায়ও কোনো কোনো স্থলে এরূপ দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে শহীদুল্লাহ্‌র ভাষ্য এই যে, কর্তৃকারকের ‘এ’-কার মাগধী প্রাকৃতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়; আরও বহু প্রাকৃতে তা ছিল। ফলে বাংলায় এর উদ্ভব সাদৃশ্যবশত হতে পারে। মাগধী-মত অনুসারীদের আরও কিছু শব্দ পর্যালোচনা করে তিনি সাদৃশ্য বা ঋণ হিসেবে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। তার চূড়ান্ত সিদ্ধন্ত : ‘বাংলা তথা তাহার সহোদরা ভাষাগুলি মাগধী প্রাকৃত হইতে উৎপন্ন হয় নাই’।

এরপর শহীদুল্লাহ্ তার নিজের মত প্রকাশ করেন। তার মতে, বাংলা উদ্ভূত হয়েছে গৌড়ী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত গৌড় অপভ্রংশ থেকে। বৈয়াকরণদের বর্ণিত কোনো ভাষার সঙ্গে এই প্রাকৃত বা অপভ্রংশ মিলবে না। তুলনামূলক ব্যাকরণের সাহায্যে এই কল্পিত ভাষার লক্ষণ বর্ণনা করেছেন তিনি। এই নাম তিনি দিয়েছেন ‘সুবিধার অনুরোধে’। আর নাম দুটি নিয়েছেন যথাক্রমে দণ্ডীর কাব্যাদর্শ আর মার্কণ্ডেয়র তালিকা থেকে। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে হারিয়ে যাওয়া ‘মূল ভাষা’ পুনর্গঠনের সুযোগ আছে—এই সুবিধা নিয়ে শহীদুল্লাহ্ এভাবে আলাদা হয়ে গেলেন। আলাদা করে নিলেন বাংলাকে। স্মরণ করা যেতে পারে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আর গ্রিয়ার্সনের মতের বাইরে গিয়ে শহীদুল্লাহ্ বাংলা-অহমিয়া-উড়িয়ার জন্য আলাদা গোত্রনাম প্রস্তাব করেছিলেন।

দুই. বাংলা ব্যাকরণচর্চা বিষয়ক মত
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাঙ্গালা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন ১৯৩৫ সালে। ভূমিকায় তিনি রবীন্দ্রনাথসহ বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সঙ্গে যুক্ত অন্য বৈয়াকরণদের স্মরণ করেছেন। বলেছেন, ‘ইহাতে খাঁটি বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ আছে, তেমনই সাধু বাঙ্গালা ভাষার সংস্কৃত উপাদানেরও ব্যাকরণ আছে’। সংস্কৃত উপাদানের ক্ষেত্রেও তিনি খানিকটা ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছেন। ইৎ-সহ প্রত্যয় নির্দেশের যে রেওয়াজ পূর্ববর্তী ব্যাকরণগুলোতে দেখা যায়, তিনি তা বাদ দিয়ে ‘ইৎ-শেষে যে প্রত্যয় থাকে’ কেবল তা-ই উল্লেখ করেছেন। ফলে তার ব্যাকরণে খল্, খ, ঘঞ্, অল্, অচ্, অট্ ইত্যাদি সমস্ত প্রত্যয়ই ‘অ’ প্রত্যয় হিসাবে নির্দেশিত হয়েছে। তার সিদ্ধান্তও এর অনুকূল : ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ শিক্ষাদানকালে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রত্যয়ের সংজ্ঞা পরিত্যাগ করা উচিত’।

তার এ ব্যাকরণের প্রশংসা করেছেন অনেকে। যেমন মুহম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন : ‘বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্বে শহীদুল্লাহ্ সাহেবের বড় কাজ হচ্ছে তার “বাঙ্গালা ব্যাকরণ”। ... [এর] প্রতিটি বিভাগেই বাংলা ভাষার বর্ণনা ব্যাপারে তার একটি সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় বিধৃত।’ কিন্তু বলতেই হবে, এই ব্যাকরণে নতুন বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়নের বিশেষ সাফল্য দেখা যায় না। তিনি মূলত ‘সংস্কৃত ব্যাকরণকে এবং তার পূর্ববর্তী প্রথাগত বাঙলা ব্যাকরণপ্রণেতাদেরই অনুসরণ করেছেন’।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ভাষা-বিষয়ক রচনাদি নিয়ে যারা আলোচনা করেছেন তাদের সবাই ব্যতিক্রমহীনভাবে উল্লেখ করেছেন, তার পাণ্ডিত্য আর সুনামের তুলনায় তার কাজের পরিমাণ কম। তার লেখা খুব পদ্ধতিমাফিক হয়নি। খুব সংক্ষেপে মন্তব্যধর্মী রচনাতেই তিনি তার মত প্রকাশ করেছেন। এ বিবেচনা সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করা আমাদের বর্তমান বিশ্লেষণের জন্য জরুরি নয়। বরং তিনি প্রণালি-পদ্ধতি মেনে লেখার চেয়ে ইনট্যুশন বা প্রজ্ঞার আলোকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তই আমাদের জন্য অধিকতর প্রাসঙ্গিক। তাতে বোঝা যায়, তিনি বাংলা ভাষাচর্চার কোনো বিকল্প ধারা তৈরি করতে হয় চাননি বা পারেননি। কিন্তু বিদ্যমান ধারা বা প্রবণতার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তার রচনা ও মতামতে সেই দ্বিধারই প্রকাশ ঘটেছে। এ সম্পর্কিত আলাপের আগে ওপরে বর্ণিত দুটি এলাকায় শহীদুল্লাহ্‌র কাজের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার।

উনিশ শতকে বাংলা ব্যাকরণচর্চার মূল লক্ষণ ছিল সংস্কৃতের ছাঁচে বাংলা ব্যাকরণকে যথাসম্ভব ঢেলে সাজানো। প্রকল্পটা শুরু হয়েছিল হ্যালহেডের ব্যাকরণ (১৭৭৮) থেকে। উইলিয়াম কেরির ব্যাকরণের দ্বিতীয় সংস্করণ (১৮০৫) থেকে ছাঁচটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পুরো প্রকল্পটির পেছনে মূল যে তত্ত্ব কাজ করে গেছে তা হলো, বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা, ফলে সংস্কৃতের ঐশ্বর্য অকৃপণভাবে গ্রহণের অধিকার বাংলার আছে। শুধু অধিকার নয়; প্রয়োজনীয়ও বটে—যে মিশ্রণ আর ‘অশুদ্ধি’ বাংলা ভাষাকে দূষিত করেছে, কেবল সংস্কৃতের রীতি-পদ্ধতি মেনেই তার নিরাকরণ সম্ভব। তত্ত্বীয়ভাবে না হলেও বাস্তবত বাংলা ব্যাকরণ আজতক এই মূলনীতিই মেনে চলছে। মাঝে শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বাংলা ব্যাকরণের স্বপ্ন ও বাস্তবতা তৈরি করেছিলেন। সে আন্দোলনের প্রভাবেই সম্ভবত সুনীতিকুমারের মহাগ্রন্থ The Origin and Development of Bengali Language (১৯২৬) উৎস ও বিকাশের বর্ণনাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে ‘বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা-বর্ণনার’ এক আকর গ্রন্থ। কিন্তু তিরিশের দশকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলা ব্যাকরণ আবার ফিরে যায় তার আগের ধারায়। অপেক্ষাকৃত নিপুণ ভঙ্গিতে অনুসরণ করতে থাকে সংস্কৃতের বর্ণনারীতি। ওই সুনীতিকুমারেরই ১৯৩৯ সালের ব্যাকরণ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বস্তুত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতায়িত বাংলা ব্যাকরণের ধারার চরম প্রতিষ্ঠা ঘটে। সে প্রতিষ্ঠা কত প্রবল আর কার্যকর, তা বোঝার জন্য অনেক পরে প্রকাশিত আরেকটি ব্যাকরণগ্রন্থের পর্যালোচনা করা যাক।

জ্যোতিভূষণ চাকীর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। সরস কথ্যভঙ্গিতে রচিত ব্যাকরণটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু এর যেকোনো অংশ পড়লেই বোঝা যায়, এটি বর্ণনামূলক নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে আনুশাসনিক। সে অনুশাসন সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন। বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রচলিত বিভাজন তিনি মেনে নিয়েছেন; তবে তাতে সংস্কৃত শব্দের পরিসর আগের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছেন। তৎসম শব্দের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সংস্কৃতের মতো’ বলতে বুঝতে হবে উচ্চারণে তফাত হলেও আকৃতিতে অর্থাৎ বানানে যা অপরিবর্তিত থাকছে তা’। এ সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের পরিচয় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ও অন্য অনেকের উত্থাপিত মূল প্রশ্ন—বাংলায় আগত সংস্কৃত শব্দগুলো আসলে কেবল দেখায় অর্থাৎ বানানে তৎসম, বলায় বা উচ্চারণে নয়—তিনি এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে পুরো বইতে ব্যবহার করেছেন বিপুল সংস্কৃত শব্দ, যেগুলো বাংলায় ব্যবহৃত হয় না। ‘প্রতিশব্দ’ অনুচ্ছেদে অগ্নি ও অগ্নিবাচক শব্দের উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে তনূনপাৎ, চিত্রভানু, বিভাবসু, কৃপীটযোনি, বায়ুসখ, হুতভুক্, হুতাশন, হব্যবাহন, বীতিহোত্র, বহ্নি, পাবক ইত্যাদি। বাংলা স্বরবর্ণের সংখ্যা, তার মতে, ১৪টি। ‘ধ্বনি বর্ণ উচ্চারণ’ শিরোনামের অধ্যায়টিতে বাংলা ভাষার এ বৈয়াকরণ সংস্কৃত উচ্চারণকে নির্দেশ করেছেন মূল-উচ্চারণ হিসেবে আর বাংলা উচ্চারণ দিয়েছেন তার বিকৃতি হিসেবে। ষত্ব ও ণত্ব বিধান, সন্ধি, প্রত্যয় ও উপসর্গসহ প্রায় সব অধ্যায়ে সংযোজিত হয়েছে এমন নিয়ম, যার অনুকূলে বাংলা ভাষা থেকে কোনো উদাহরণই দেওয়া যায়নি। এর মধ্যে প্রত্যয়ের আলোচনা সবচেয়ে সুলিখিত; কারণ এ অধ্যায়ের সূত্রগুলো প্রত্যয়ের রূপসহ হুবহু সংস্কৃত থেকে নেওয়া হয়েছে।

এই মানচিত্র মনে রাখলে শহীদুল্লাহ্‌র ব্যাকরণ-প্রকল্পের তাৎপর্য বোঝা যাবে। তিনি অনুসরণ করতে চেয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখের প্রস্তাব। প্রস্তাবের বাস্তবায়নে তিনি সফল হননি। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মনে রাখলে বোঝা যায়, তার এই ব্যর্থ প্রকল্প আসলে প্রচলিত ব্যাকরণধারায় তার অস্বস্তিরই প্রকাশ। নতুনত্বটা এসেছে এই অস্বস্তি থেকে। পরবর্তীকালে যারা নতুন ব্যাকরণ রচনা করতে চেয়েছেন তাদের কাছে শহীদুল্লাহ্‌র উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণই মনে হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার উৎপত্তি-সম্পর্কিত শহীদুল্লাহ্‌র মত পঠিত হওয়া দরকার। তার মতের পক্ষে তিনি যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করেননি; তার মত উত্তরকালীন বিশ্লেষকরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনাও করেননি। স্পষ্টই বোঝা যায়, শহীদুল্লাহ্‌র কাছে প্রকল্পটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ প্রচলিত প্রকল্পে তিনি স্বস্তিবোধ করছিলেন না। তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান একটি প্রকল্পনির্ভর বিজ্ঞান, যেখানে খুব সহজেই আর্যভাষার নামে পশ্চিম ইউরোপ আর ভারতকে মিলিয়ে দেওয়া যায়, মাগধী প্রাকৃতের বিশাল ভূগোলের সঙ্গে বাংলাকে সম্পর্কিত করে বাংলাকে খাঁটি ‘আর্যভাষা’ করে তোলা যায়, আর ‘হস্ত—হত্থ—হাত’-এর মতো শিশুতোষ সব ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করে বাংলাকে ভালোভাবেই সম্পৃক্ত করা যায় পশ্চিম ভারতের সঙ্গে। শহীদুল্লাহ্ এই প্রকল্পনির্ভর বিজ্ঞানকে প্রশ্ন করেননি, কারণ তার নিজেরও সম্বল সেই বিজ্ঞানই। সেই সম্বলে ভর করে নিজস্ব প্রকল্পে তিনি কথামালা ও যুক্তি সাজিয়েছেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে অনার্য ভাষার গভীর সাদৃশ্যের দিকে শহীদুল্লাহ্‌র চোখ পড়েছিল অন্য অনেকের আগেই। ‘“বাঙ্গালা ভাষায় মুণ্ডা প্রভাব”-এর আলোচনাটি নব্যভারতীয় আর্যভাষাতত্ত্বে তার অন্যতম মৌলিক অবদান।’ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তিনি এই সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। সন্দেহ নাই, তার ভাষা-প্রকল্পই তাকে এদিকে নজর ফেরাতে উৎসাহিত করেছিল।