টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কুমিল্লা

সড়ক-হাসপাতালে পানি, নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা

রাতভর টানা ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমড় সমান পানি জমে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, দিনমজুর ও কর্মজীবীরা।

সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। তবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, বিলম্বে পৌঁছানো পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে সহানুভূতিশীল হওয়ার এবং অতিরিক্ত সময় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি বিভাগ এবং রোগীদের শয্যার নিচেও পানি জমে রয়েছে।

একই সঙ্গে নগরীর মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, বাগানবাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শহরতলীর ছায়াবিতান এলাকায় সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নিচু স্থাপনায় পানি ঢুকে পড়েছে। ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে সদর হাসপাতাল সড়কের ওষুধ ব্যবসায়ী দিদারুল আলম সুমন বলেন, গত ১০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আমার দোকানের ভেতরে পানি ঢুকেছে। একই এলাকার বাসিন্দা তফাজ্জল হোসেন তজু বলেন, বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে পড়েছে। ড্রেন ও নালা দিয়ে পানি ধীরগতিতে নামার কারণেই এই জলাবদ্ধতা।

মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী তাছলিমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখা উচিত ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে কেন্দ্রে আসতে হয়েছে। অনেকেই পানিতে ভিজে পরীক্ষা দিচ্ছে। অনেক পরীক্ষার্থীকে পানিতে ডুবে থাকা সড়কে পড়ে যেতেও দেখা গেছে। এ সময় অভিভাবকদেরও পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে, দ্বিগুণ রিকশা ভাড়া
জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন চালকেরা। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশে সহায়তার জন্য শেষ পর্যন্ত নৌকার ব্যবস্থাও করতে দেখা যায়।

কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। দিনভর আরও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার বলেন, এ কেন্দ্রে আটটি কলেজের প্রায় ২ হাজার ১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। মাঠে পানি জমলেও পরীক্ষার কক্ষের ভেতরে পানি ঢোকেনি। যেসব পরীক্ষার্থী বিলম্বে পৌঁছেছেন, তাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার জন্য নির্দেশনা রয়েছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ বলেন, বোর্ডের অধীন ছয় জেলায় ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে ও সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো কেন্দ্রের পরীক্ষার কক্ষে পানি ঢোকেনি। জলাবদ্ধতার কারণে বিলম্বে কেন্দ্রে পৌঁছানো পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে কেন্দ্রসচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, কোনো পরীক্ষার্থী সমস্যায় পড়বেন না।

এ বিষয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ পানি হাসপাতাল চত্বরে ঢুকেছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলে পানি নেমে যাবে বলে আশা করছি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অবস্থান করে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে প্রবেশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন।