বন্যার্তদের সহায়তা করা ইবাদত

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য নদ-নদী এই দেশের বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে, যা একদিকে আমাদের জীবন ও জীবিকার উৎস, আবার অন্যদিকে মাঝে মাঝে হয়ে ওঠে ভয়াবহ বন্যার কারণ। বন্যা যখন আসে, তখন তা ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার নষ্ট করে, কেড়ে নেয় অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, জীবন ও জীবিকার অবলম্বন। মানুষ তখন অসহায় হয়ে পড়ে, একটু বিশুদ্ধ পানির জন্য, এক মুঠো খাবারের জন্য, একটুখানি আশ্রয়ের জন্য তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই মুহূর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে এক মহৎ ইবাদত।

মানবসেবা ইবাদত : ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে মানবতার সেবাকেও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যে ব্যক্তি অন্যের উপকার করে, কষ্টে থাকা মানুষকে সাহায্য করে, সে আল্লাহর কাছে প্রিয় বান্দা হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে মানুষের উপকার করে।’ (সহিহ বুখারি)

অপর হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দুঃখ-কষ্ট দূর করে, আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন তার দুঃখ দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯) অতএব বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা, আর তা ইসলামে এক বিশুদ্ধ ইবাদত।

কোরআনের নির্দেশনা : পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা ২)

অপর জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘তারা খাদ্য দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দরিদ্র, এতিম ও বন্দিকে, (বলে) আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের আহার দিচ্ছি, তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা ইনসান ৮-৯) এই আয়াত আমাদের শেখায়, বন্যার্ত মানুষদের সহায়তা করতে হবে নিখাদ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, কোনো প্রশংসা বা পুরস্কারের আশায় নয়।

নবীজির দানশীলতা ও সহমর্মিতা : রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তার জীবন ছিল দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি কখনো নিজের জন্য কিছু জমিয়ে রাখতেন না। কেউ সাহায্য চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তা দিয়ে দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সহায়তা করে, আল্লাহতায়ালা তার সাহায্য করেন।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯) বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করার মানে হলো এই নববি আদর্শ অনুসরণ করা।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো কেন ইবাদত, এই বিষয়ে বিবরণী উল্লেখ করা হলো। এক. এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়। আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথ। দুই. এটি সমাজে করুণা ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করে। সহানুভূতির সম্পর্ক সমাজে ঐক্য আনে। তিন. এটি পাপ মোচনের উপায়। এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দান পাপ নষ্ট করে যেমন পানি আগুন নেভায়।’ (তিরমিজি ৬১৪) চার. এটি জান্নাতে প্রবেশের পথ খুলে দেয়। কারণ আল্লাহ করুণাময়দেরই ভালোবাসেন।

সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টান্ত : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা দান ও সহায়তায় ছিলেন অনন্য। হজরত ওমর (রা.) ও ওসমান (রা.) বিভিন্ন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। একবার মদিনায় খাদ্য সংকট দেখা দিলে হজরত ওসমান (রা.) নিজের গুদামের সমস্ত খাদ্যসামগ্রী দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। আজ যদি আমরা বন্যার্তদের পাশে সেভাবে দাঁড়াই, তবে আমরাও নবী করিম (সা.) ও সাহাবিদের অনুসারী হতে পারি।

বন্যার্তদের সহায়তার কিছু বাস্তব রূপ : এক. খাদ্য বিতরণ। চিঁড়া, গুড়, পানি, শুকনো খাবার, দুধ ইত্যাদি সরবরাহ করা। দুই. ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা। বিশেষত পানিবাহিত রোগের ওষুধ দেওয়া। তিন. আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান। স্কুল-মাদ্রাসা বা মসজিদে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা। চার. পুনর্বাসন সহায়তা। বন্যার পর ঘর মেরামত, কৃষকদের বীজ বা সার সরবরাহ করা। এই প্রতিটি কাজ যদি নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তবে তা হয়ে যায় ইবাদত ও সওয়াবের কাজ।

আত্মার পরিশুদ্ধি : দান ও সহানুভূতি মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, অহংকার ও লোভ দূর করে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবে।’ (সুরা তওবা ১০৩) অতএব, যারা বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে, তারা শুধু অন্যের কষ্টই কমায় না; বরং নিজের আত্মাকেও শুদ্ধ করে নেয়।

সমাজে ঐক্য ও ভালোবাসা : যখন সমাজের বিত্তবান শ্রেণি বিপদে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়ায়, তখন সমাজে ঐক্য ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। হিংসা-বিদ্বেষ কমে যায়, আর মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। ইসলামে সমাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজরাত ১০) অতএব, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো মানে সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন : বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু এটি আমাদের জন্য এক আল্লাহপ্রদত্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফল হয় সেই মানুষ, যে অন্যের কষ্টে কাঁদে, সাহায্যের হাত বাড়ায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, আল্লাহতায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করেন।’ (সহিহ বুখারি ২৪৪২)

তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াই। খাবার, ওষুধ, আশ্রয়, পোশাক ও ভালোবাসা দিয়ে তাদের কষ্ট লাঘব করি।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর