একটি ঘর। একটি পড়ার টেবিল। তিনটি চেয়ার। পাশাপাশি বসে তিনটি ছোট্ট মুখ। কখনও গণিতের অঙ্কে ব্যস্ত, কখনও বাংলা কবিতা মুখস্থ করছে, আবার কখনও একজন আরেকজনকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কঠিন কোনো পাঠ। বাইরে বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসে, কিন্তু তাদের বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ থামে না। সেই ছোট্ট পড়ার টেবিল থেকেই শুরু হয়েছিল তিনটি স্বপ্নের যাত্রা। আর সেই যাত্রারই অনন্য গন্তব্য তিনজনের হাতেই এখন ট্যালেন্টপুলের বৃত্তির সনদ।
বরগুনার শিক্ষাঙ্গনে বিরল এই কৃতিত্বের গল্পের নায়িকা ত্রিযমজ তিন বোন, অন্বেষা হালদার, অঙ্কিতা হালদার ও অনুষ্কা হালদার। একই মায়ের গর্ভে জন্ম, একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং একই ফলাফল, তিনজনই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত। এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের আনন্দের নয়; এটি পুরো বরগুনার জন্য গর্বের এক অধ্যায়।
দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের শিক্ষক পরিবারটিতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল ছোটবেলা থেকেই। বাবা চিন্ময় হালদার বরগুনার গৌরীচন্না নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা কাজলী রানী গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাই বই, খাতা, পাঠ আর শৃঙ্খলার মধ্যেই বেড়ে উঠেছে তিন বোনের শৈশব। তবে শুধু শিক্ষক বাবা-মা থাকলেই যে সাফল্য আসে, তা নয়। সেই সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রতিদিনের নিরলস পরিশ্রম, সময়ের সঠিক ব্যবহার, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং একে অপরকে এগিয়ে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিন বোনের মধ্যে ছিল এক অসাধারণ বোঝাপড়া। একজন কোনো বিষয় আগে বুঝে ফেললে অন্য দুজনকে বুঝিয়ে দিত। পরীক্ষার আগে তারা একে অপরকে প্রশ্ন করত, ভুল ধরিয়ে দিত, আবার একসঙ্গে অনুশীলনও করত। প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু তা ছিল সুস্থ প্রতিযোগিতা, হারানোর নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা।
এবারের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ের ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনই বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৭ জন ট্যালেন্টপুলে এবং ৪ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেছে। তবে সব অর্জনের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একই পরিবারের ত্রিযমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভের ঘটনা। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক থেকে শুরু করে পুরো এলাকায় এখন এই সাফল্যের গল্পই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদ্য প্রকাশিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলে জেলার ছয়টি উপজেলায় মোট ৭৫৮ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে ৩৫৬ জন এবং সাধারণ গ্রেডে ৩৬৩ জন বৃত্তি অর্জন করেছে। এছাড়া বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে ১৬ জন ও সাধারণ গ্রেডে ২৩ জন বৃত্তি পেয়েছে। সেই পরিসংখ্যানের ভিড়েও অন্বেষা, অঙ্কিতা ও অনুষ্কার নাম আলাদা করে উচ্চারিত হচ্ছে তাদের ব্যতিক্রমী অর্জনের কারণে।
বর্তমান সময়ে যখন অনেক শিশু মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে, তখন এই তিন বোন যেন ভিন্ন এক বার্তা দিয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, নিয়মিত অধ্যবসায়, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবারের ইতিবাচক পরিবেশ থাকলে সাফল্য কখনও দূরে থাকে না।
ত্রিযমজ তিন কন্যার বাবা চিন্ময় হালদার বলেন, ‘ওদের কখনও পড়তে বসানোর জন্য চাপ দিতে হয়নি। নিজেরাই সময়মতো বই নিয়ে বসত। শুধু মুখস্থ নয়, প্রতিটি বিষয় বুঝে শেখার চেষ্টা করত। একজন কোনো বিষয়ে ভালো করলে অন্য দুজনও আরও ভালো করার চেষ্টা করত। আবার কেউ কোনো বিষয় না বুঝলে অন্য দুজন বুঝিয়ে দিত। এভাবেই ওরা একে অপরের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি ওরা খুবই ভদ্র, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল। বড়দের সম্মান করে, ছোটদের স্নেহ করে এবং সুযোগ পেলেই মায়ের সংসারের কাজে সহযোগিতা করে। অবসর সময়ে বই পড়ে, ছবি আঁকে, গল্প করে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওদের মা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা। একজন বাবা হিসেবে আমি খুবই গর্বিত।’
তিন বোনের শ্রেণিশিক্ষক মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘তারা তিনজনই অত্যন্ত মনোযোগী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী। ক্লাসে নিয়মিত পাঠ প্রস্তুত করে আসত। কোনো বিষয় না বুঝলে বারবার জানতে চাইত। তাদের শেখার আগ্রহই আজকের এই সাফল্যের মূল কারণ।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একই পরিবারের ত্রিযমজ বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনের বৃত্তি অর্জন আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াসী মতিন বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। এই সাফল্য শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। আগামী প্রজন্মের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।