চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারে চাঁদার দাবিতে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে তাদের কঠিন শাস্তি হবে কি না তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘এদের খুঁটির জোর কোথায়? এই লক্ষণ খুব ভালো নয়।’ গতকাল মঙ্গলবার সকালে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তিনি এ সব কথা লেখেন।
জামায়াত আমির লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীতে এক ইন্টারনেট ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তান্ডব চালানো দুর্বৃত্তদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে তা প্রকাশ করুন। তাদের পাকড়াও করে আইনের আওতায় আনুন। জানি না, কঠিন শাস্তির বিধান হবে কি না। লক্ষণ খুব ভালো নয়।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘জনগণকেই এখন নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সরকার কোনো কার্যকর নিরাপত্তা দিতে পারছে না। একের পর এক অভিনব ঘটনা ঘটেই চলছে।’
প্রসঙ্গত, গত সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারের এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (ডিডিএন) মালিক আদিল বিন মামুনের কাছে চাঁদা দাবি করে তাকে হুমকি দেন শীর্ষসন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ডেবিট ইমন। তার কথামতো চাঁদা না দেওয়ায় দুই দিন পার হওয়ার পর সোমবার ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে মুখোশধারী একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত।
প্রতিষ্ঠানটির লোকজন বলেন, সাজ্জাদ গ্রুপ দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। টাকা না পেয়ে এ হামলা চালিয়েছে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার দুপুরে ১৫-২০ জনের একটি দল কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। তিন মিনিট ভাঙচুর চালিয়ে অফিস ত্যাগ করে দুর্বৃত্তরা।
জুলাই শহীদদের কাছে আমরা ঋণী : মহান ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে শহীদদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করার জন্য সব শাখা সংগঠন ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘১৬ জুলাই জুলাই শহীদ দিবস আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক গৌরবময় ও বেদনাবিধুর দিন। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করি সেসব শহীদ ভাই-বোনকে, যারা বৈষম্য, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন। আমি সব শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহত ও নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কৃতী ছাত্র আবু সাঈদ নিজের অধিকার আদায়ের দাবিতে পুলিশের সামনে বীরদর্পে বুক পেতে দাঁড়ান। সে সময় স্বৈরাচারী সরকারের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ বাহিনী নির্মমভাবে গুলি করে তাকে হত্যা করে। শহীদ আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশে কোটাবিরোধী আন্দোলন এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
বিবৃতিতে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই গণআন্দোলন ছিল আমাদের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তরুণ-তরুণী, নাগরিক সমাজ ও সর্বস্তরের পেশাজীবী মানুষ অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসেন। একপর্যায়ে ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে উন্মত্ত হয়ে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির একাংশের মাধ্যমে নির্বিচারে চালানো গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মুক্তিকামী মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। কয়েক হাজার মানুষ তাদের হাত, পা বা চোখ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘অবশেষে ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর ধরে জাতির ঘাড়ে চেপে বসা একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। পতন নিশ্চিত জেনে শেখ হাসিনাসহ তার দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও মন্ত্রী-এমপিরা ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে দেশের মানুষ খুনি, স্বৈরাচারী ও তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের আধিপত্য থেকে মুক্তি লাভ করে। আজ দেশের জনগণ মুক্ত ও স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছে, রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এ সবই জুলাই গণআন্দোলনের গৌরবময় ফসল।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের শহীদরা নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ জাতিকে এক মহৎ ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। আজ আমাদের শপথ নিতে হবে শহীদদের রক্ত যেন কোনোভাবে বৃথা না যায়। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়বিচারভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা তাদের এই ঋণ আংশিক পরিশোধ করতে পারি। আগামীকাল ১৬ জুলাই আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদায় মহান ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালন করার জন্য আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সব শাখা সংগঠন ও দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’