অতিবৃষ্টি-বন্যা

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি

কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলা আবারও বন্যার কবলে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার বড় প্রভাব পড়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। কৃষির এ দুটি উপখাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দুটি প্রতিবেদনে।

দুই অধিদপ্তরের তৈরি করা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাত। এ খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি। যেখানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও নোয়াখালী রয়েছে। এ ছাড়া খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, ভোলাসহ রংপুরের বেশকিছু জেলার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি জেলায় প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার।

মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, মৎস্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬০২টি ইউনিয়নের ১২ হাজার ৪৩ মেট্রিক টন স্বাদু পানির মাছ, ১ হাজার ৪৪৯ মেট্রিক টন চিংড়ি, ১ হাজার ৮৫৭ লাখ পোনা এবং ২ কোটি ৫৯ লাখ রেণু ভেসে গেছে। সব মিলে স্বাদু পানির মাছের ক্ষতি হয়েছে ২১৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার। ৩০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অঙ্কে চিংড়ির ক্ষতি হয়েছে।

এর বাইরে ঘের, নৌযান, মাছ ধরার জাল, পুকুর, সøুইসগেটসহ নানা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে সাড়ে তিনশ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে জানানো হয়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির ১৫৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ গরু, ৪ হাজার ১৪৮টি মহিষ, ১ লাখ ১২ হাজার ৬৫৫টি ছাগল, ২৪ হাজার ৭৯৫টি ভেড়া, ১১ লাখ ৯১ হাজার ২০টি মুরগি এবং ২৪ হাজার ২৮টি হাঁস বন্যাকবলিত হয়েছে।

এর মধ্যে পাঁচটি জেলায় গরু ৪৫টি, ছাগল ১২৩টি, ভেড়া ৪০টি, মুরগি ১ লাখ ১ হাজার ১৯৮টি এবং ১ হাজার ৫২১টি হাঁস মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫টি গবাদি পশুর খামার এবং ৬৩টি হাঁস-মুরগির খামার। এতে ১১৮ মেট্রিক টন গো-খাদ্য নষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে গো-খাদ্য, অবকাঠামো, প্রাণীর মৃত্যুতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ৩০ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়।

১ লাখ ১৪ হেক্টরের ফসল ক্ষতির মুখে : দেশজুড়ে অতিভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এখন পর্যন্ত ৪৩টি জেলা। এর মধ্যে বেশি মাত্রায় আক্রান্ত ১৬টি। এসব জেলায় গত সোমবার পর্যন্ত ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এতে ৫ লাখের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, পেঁপেসহ অন্যান্য ফসল। সার্বিকভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বলছে, বেশি মাত্রায় আক্রান্ত জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী।

এ ১৬ জেলায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর, যা সারা দেশের মোট আক্রান্ত জমির প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া ওইসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সংখ্যা ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬ জন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান ম-ল জানান, অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি নিরূপণ করা যাবে।

তিনি বলেন, ফসলের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করাই এখন অগ্রাধিকার। এজন্য অধিদপ্তর নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রাথমিক হিসেবে ৫ লাখ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এটা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বীজ, চারাসহ সব ধরনের সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে প্রদান করা হবে বলে জানান তিনি।