টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় পাঁচ লাখ কৃষককে আমন চাষে সহায়তা দেবে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বিনামূল্যে বীজ ও সার পাবে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গবাদিপশুর জন্য শুকনো খাদ্য এবং খুরারোগ প্রতিরোধক ভ্যাকসিনও দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে পাঁচ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
কৃষিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল মঙ্গলবার সকালে একটি জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। সেখানে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও খামারিদের সহায়তার সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বক্ষণিক দুর্গত এলাকার খোঁজখবর নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, আমন মৌসুমে দেশের খাদ্য চাহিদার একটি বড় অংশ উৎপাদন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী সর্বশেষ আমন মৌসুমে প্রায় ৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে ধান ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল। হেক্টরপ্রতি ফলনের পরিমাণ সাড়ে তিন টন থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় টন। গত ৬ জুলাই থেকে সপ্তাহব্যাপী ভারী বর্ষণে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবানসহ সাত জেলায় আকস্মিক বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। বন্যা ও পাহাড়ধসে ৫১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গৃহহীন হয়ে পড়েছে বহু মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ ও সার বিনামূল্যে দেওয়া হবে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। অনেক এলাকায় ধানের চারা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের নতুন করে বীজ রোপণ করতে হবে। এদিকে বীজতলাও ডুবে গেছে। আমনের চারা রোপণ করতে আগস্টের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে। এর মধ্যে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সহায়তা করা যায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে নতুন বীজতলা খুঁজে বীজ বপন করে সেখান থেকে চারা সরাসরি কৃষককে দেওয়া হবে। এ ছাড়া যেসব কৃষক, খামারি ও মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারাও জরুরিভিত্তিতে খুরারোগের টীকাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবেন।
মন্ত্রী জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত বিকল্প বীজতলা তৈরির জন্য বিএডিসি, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বীজ বপন করে উৎপাদিত চারা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করবে। নগদ সহায়তা দেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নগদ সহায়তার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী একটি প্যাকেজ সহায়তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
বন্যার কারণে খড়, ঘাস ও পশুখাদ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এ জন্য দুর্গত এলাকায় গরু-ছাগলের জন্য শুকনো খাদ্য সরবরাহ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদেরও তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং তাদের সহায়তায়ও পদক্ষেপ নেবে সরকার।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সাধারণত বর্ষা ও বন্যার সময় গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে খুরারোগ বেশি হয়। খুরারোগ গবাদিপশুর জন্য বেশি ক্ষতিকর। তাই বিনামূল্যে খুরারোগের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।
কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীরা জানান, এখনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য ছাড়াও রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্তারিত চিত্র পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। এ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খানও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
গুজব না ছড়াতে অনুরোধ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, একজন অন্তঃসত্তা নারী বন্যার পানির তোপ থেকে রক্ষা পেতে একটি গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে সহায়তার জন্য কেউ নেই। ফ্যাক্টচেক করে দেখা গেছে যে, ওই ছবিটি হাওর এলাকায় একটি নাটকের দৃশ্য থেকে নেওয়া। অথচ ফটোকার্ড করে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বন্যার ভয়াবহতা দেখানোর উদ্দেশ্যে। এমন দায়-দায়িত্বহীন না হয়ে সংশ্লিষ্টরা দুঃসময়ে দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করবেন বলে আমরা আশাবাদী।