‘অদৃশ্য’ সংরক্ষণাগার নির্মাণে ভৌতিক ব্যয়ের নজির

সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) অবকাঠামো নির্মাণের ব্যবস্থা রেখেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যয় না করে খরচ দেখানোর অনন্য নজির গড়েছে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্মাণ প্রকল্প। ১৬ জেলায় নির্মিত কার্যালয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থার পেছনে ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তত্ব পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া খরচের খাতায় ব্যয়ের তথ্য থাকলেও ভবনের আঙ্গিনায় পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ করা হয়নি। একই সঙ্গে ৪ বছরেই আটটি অফিসের সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকাজ শেষ হলেও এখনো কোনো বাহ্যিক অডিট হয়নি। এসব অনিয়ম ও দুর্বলতার তথ্য ওঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।

আধুনিক পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৬ সালে ‘১৭টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট (সংশোধিত ১৬টি) অফিস নির্মাণ (২য় সংশোধন)’ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। শুরুতে ১০৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও পরে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ১০৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা করা হয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয় ৯৭ কোটি ৭৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর, জামালপুর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে মোট ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় গাজীপুরের অফিসটি প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে নির্মাণ করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীনে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা ছিল বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয় প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনো বাহ্যিক অডিট হয়নি। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ১৫ লাখ ১ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনে (পিসিআর) এ খাতে ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে। তবে আইএমইডি সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো অফিসেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থার অস্তিত্ব পায়নি। একইভাবে, বনায়নের জন্য ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ এবং ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও বেশিরভাগ অফিস প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ করা হয়নি।

সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মধ্যে জামালপুর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মাগুরা, বাগেরহাট, নেত্রকোনা ও নওগাঁ কার্যালয়ের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল রয়েছে। সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা মেরামতের কাজ চলমান। শরীয়তপুর কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল থাকলেও স্টোরেজ ব্যাটারিগুলো অকার্যকর হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে গেছে। এ ছাড়া ভোলা কার্যালয়ে সৌর প্যানেলের একটি অংশ অকার্যকর ও নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।

নির্মাণমান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমইডি। বিশেষ করে ভোলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ভবনের মান সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার খসে পড়েছে, বাইরের রঙ নষ্ট হয়েছে এবং দেয়ালে শেওলা জমেছে। বজ্রনিরোধক দ- কার্যকর না থাকায় ভবনটি  ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বজ্রনিরোধক দ- ভবনের সর্বোচ্চ স্থানে স্থাপন করা হয়নি। ফলে বজ্রপাতের সময় ভবন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর না হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ করতে পারছে না।

একনেক ২০১৬ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটি অনুমোদন কররে। এর ১৭ জুলাই প্রথম প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে কাজ বাস্তবায়নকালে মোট ছয়বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। আইএমইডি প্রতিবেদনে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি দুর্বলতা দূর করতে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কোনো বাহ্যিক অডিট হয়নি। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ অডিট করা প্রয়োজন। ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মধ্যে সাতটি বর্তমানে অকেজো থাকায় সেগুলো নতুন চালু করে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা ও বিদ্যুৎ বিল কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বাগেরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ভবন দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভবনগুলোর মেরামত কার্যক্রম শুরু, মাদারীপুর পাসপোর্ট অফিসে বজ্রনিরোধক দ- ভবনের সর্বোচ্চ স্থানে পুনঃস্থাপন এবং ভোলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিম্নমানের নির্মাণকাজ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।

পিসিআর ও আরডিপিপিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও বনায়ন খাতে ব্যয়ের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রমাণ না মেলায় বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই সহজ করতে ই-পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বায়োমেট্রিক ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ) এটিএম আবু আসাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। বিস্তারিত জেনে পরে মন্তব্য করবেন। তবে তার দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলার পাসপোর্ট অফিস অন্য অনেক সরকারি অফিসের তুলনায় বেশি পরিচ্ছন্ন এবং গাছপালাও তুলনামূলক বেশি রয়েছে।