১১ বছর পর চালু হওয়া অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এবার মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে যখন অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরীক্ষার্থীরা দিশেহারা ঠিক তখনই শিক্ষকের করা ভুল প্রশ্নে উত্তাল সারা দেশ। আর এই ভুল প্রশ্নপত্রের জন্য সিলেট শিক্ষাবোর্ডের আওতাধীন কলেজের চার শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে এবং শোকজের অপেক্ষায় আছেন আরও চার শিক্ষক।
দেশের পাবলিক পরীক্ষার ইতিহাসে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুলের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানু দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভাগ্য নিয়ে শিক্ষকরা খেলতে পারেন না। এই প্রশ্নপত্র ভুলের সঙ্গে ইতিমধ্যে চার শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। এই চার শিক্ষক হলেন সিলেট বোর্ডের আওতাধীন কলেজের। এসব শিক্ষক প্রশ্নপত্র মডারেশন করেছিলেন। এছাড়া প্রশ্নকর্তা চার শিক্ষককেও শোকজ করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শোকজ পাওয়া চার শিক্ষক হলেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, সিলেট এমসি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান ও সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এই চার শিক্ষককে শোকজ করেছেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মডারেশনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। কেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না সে জন্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে শোকজের লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন প্রণয়নের পর মূলত মডারেশনের দায়িত্বে যারা থাকেন তারাই চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন। এজন্য সিনিয়র শিক্ষকরা মডারেশনের দায়িত্ব পালন করেন। তাহলে এসব শিক্ষক কীভাবে ভুল করলেন? প্রশ্নের মডারেশনের সময় বোর্ডের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ৬দিন উপস্থিত থেকে করতে হয়। প্রতিদিনের জন্য ২০০০ টাকা করে সম্মানী ভাতাও পান। এই শিক্ষকরা কি মডারেশনে উপস্থিত ছিলেন? এই প্রশ্নের জবাবে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, ‘উনারা সিনিয়র টিচার এবং বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উপস্থিতও ছিলেন। তারপরও প্রশ্নপত্রে কেন ভুল হয়েছে তা জানি না।’
জানা যায়, এবার প্রতিটি বোর্ড থেকে প্রতি বিষয়ের জন্য চার জন শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্নপত্র ও দুজন শিক্ষক নৈর্ব্যত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছেন। এই শিক্ষকদের প্রণীত প্রশ্ন মডারেশন করেছেন চার শিক্ষক। তারা চারটি প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করেছেন। সেক্ষেত্রে দেশের ৯টি শিক্ষা বোর্ড থেকে পদার্থবিজ্ঞানের ৩৬টি সৃজনশীল প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে। এই ৩৬টি প্রশ্নপত্র থেকে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, ৩৬টি প্রশ্ন থেকে লটারির মাধ্যমে দুটি প্রশ্ন সিলেক্ট করে আমরা বিজি প্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছি কোড নম্বর দিয়ে। সেই দুটি প্রশ্নের দুটি সেট কোড থাকে। সেই প্রশ্ন পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে চলে যায়। পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে লটারির মাধ্যমে একটি সেট কোড চূড়ান্ত করে তা বোর্ড চেয়ারম্যান হয়ে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে কেন্দ্র সচিবদের জানিয়ে দেওয়া হয়। সেই আলোকে পরীক্ষা নেওয়া হয়।’
তাহলে ভুল হওয়া প্রশ্নপত্রটি যে সিলেট বোর্ডের তা কীভাবে নির্ধারণ করলেন? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, আমরা গতকাল (মঙ্গলবার) সকালে বিজি প্রেসের কাছে চিঠি দিয়েছি পরীক্ষা নেওয়া প্রশ্নপত্রটি কোন কোডের। সেই কোড বিজি প্রেস জানালে আমরা চেক করে দেখি তা সিলেট বোর্ডের প্রশ্ন ছিল। এখন সিলেট বোর্ডের পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্ন মডারেশন কে করেছে সেই তালিকা সিলেট বোর্ডের কাছে রয়েছে। এভাবে আমরা শিক্ষককে নির্ধারণ করেছি। একইভাবে এই প্রশ্নের সেটার (যিনি প্রশ্ন করেছেন) চারজনকেও আমরা শাস্তির আওতায় আনব।
প্রশ্নপত্রে ভুল হলো কেন? : চার শিক্ষক প্রশ্ন করেছেন, সেই প্রশ্নকে বোর্ডে ছয় দিন উপস্থিত থেকে মডারেশন করেছেন চার সিনিয়র শিক্ষক। তারপরও ভুল কীভাবে হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, অনেক সময় সিনিয়র ও অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রশ্ন করলে মডারেশনের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র শিক্ষকরা গা ভাসিয়ে দেন। হয়তো এই শিক্ষকরা প্রশ্নপত্রটি খেয়ালই করেননি। আর তাদের বেখেয়ালির কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য : তবে এই প্রশ্নকে ভুল বলার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রশ্নটি অনেকটা উন্নত হয়েছে এবং তা ইউনিক। তবে এটা সঠিক যে প্রশ্নটি ভালো ছাত্রদের জন্য হয়েছে। সাধারণ অনেক শিক্ষার্থী হয়তো তা সমাধান করতে পারবে না। আর এই প্রশ্ন গাইডেও থাকার কথা নয়।’
তিনি বলেন, এই প্রশ্নপত্রটি নিয়ে আমরা মডারেশনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষক আজও আলোচনা করেছি এবং আমাদের কাছে প্রশ্নটি সমাধানযোগ্য মনে হয়েছে। তবে এখন যেহেতু শোকজ করা হয়েছে তাই এর জবাব আমরা জানাব।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই সোমবার পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের পরীক্ষায় ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে অসংগতি পাওয়া গেছে। এজন্য সারা দেশে পরীক্ষার্থীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং এ জন্য শিক্ষার্থীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে আশ^স্ত করা হয়েছে। এই দুই প্রশ্নে ২০ নম্বর দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।