আইএমফের ম্যারাথন বৈঠক

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ সফরে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল। গত ১২ জুলাই সফরের শুরু থেকেই দলটির সদস্যরা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা। এ সময় সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো, অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে এ সব আলোচনায় স্থান পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গতকাল সকাল থেকে শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। আইএমএফের পক্ষে সংস্থাটির মিশন প্রতিনিধি আইভো কার্জনার ও হেনরি ওয়েইচেং উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকে সকালের বৈঠকে দেশের বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি) বা পরিশোধ ভারসাম্য, বৈদেশিক অর্থায়ন এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং বৈদেশিক অর্থপ্রবাহে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিওপির সর্বশেষ চিত্র এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও পূর্বাভাস নিয়ে আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুপুরের পর থেকে আলোচনায় বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস, প্রাপ্যতা ও ঝুঁকি, বিনিময় হার সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নীতিগত বিষয়গুলো ছিল। নতুন বিনিময় হার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, বৈদেশিক মুদ্রার অগ্রিম (ফরওয়ার্ড) লেনদেন, আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের কার্যক্রম, বাজার তদারকি, জল্পনামূলক লেনদেন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং বিনিময় হার নির্ধারণের সাম্প্রতিক দিকনির্দেশনাও পর্যালোচনা হয়।

বিকেলে বৈঠকে রেমিট্যান্স ও শ্রম বাজারের কাঠামো, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিবর্তন, বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আর্টিকেল-৮ সংক্রান্ত বিষয়, বিওপি বা পরিশোধ ভারসাম্যের পরিসংখ্যান তৈরির পদ্ধতি, তথ্যের ঘাটতি ও অসঙ্গতি, তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসের ভিত্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

তবে আলোচনার বিষয়বস্তু বা অগ্রগতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা আইএমএফের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংক বা আইএমএফের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলমান আলোচনা আরও দুদিন অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার ভিত্তিতে আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে জানান, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচনার সিদ্ধান্ত আগামী ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

বাংলাদেশ এর আগে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় একাধিক অর্থবছরে বড় রকমের অর্থায়ন পেয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি (৪.৭০ বিলিয়ন) ডলারের ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি (৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন) ডলার হয়। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর। তখন আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ।

এদিকে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনা প্রসঙ্গে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জনস্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে অংশ নেবে বাংলাদেশ। পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের নেওয়া আইএমএফের আগের প্রোগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী। সেই কর্মসূচিতে এমন অনেকগুলো শর্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কারণেই বর্তমান সরকার পূর্বের প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে।