'অমর দল, ঈশ্বরের মাথা, সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে মেসি'

২০২৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য ও নাটকীয় জয়ের রেশ আছড়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আটলান্টায় আলবিসেলেস্তেদের এই লড়াকু পারফরম্যান্স, অধিনায়ক লিওনেল মেসির জাদুকরী নেতৃত্ব এবং নিউ ইয়র্কে স্পেনের বিরুদ্ধে আসন্ন মেগা ফাইনালকে কেন্দ্র করে তাদের প্রচ্ছদ সাজিয়েছে। আটলান্টার মাঠে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিল, তা বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম হেরাল্ড স্পোর্ট ইংলিশ ফুটবলের এই বিদায়কে “লো ব্লো” (মারাত্মক আঘাত) শিরোনামে প্রকাশ করেছে। তারা লিখেছে, মেসির আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তের প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ ৬০ বছরের লালিত বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

স্বয়ং ইংল্যান্ডের গণমাধ্যমে ছিল চরম হতাশা আর বেদনার সুর। দ্য গার্ডিয়ান সরাসরি শিরোনাম করেছে: “চেঞ্জ অ্যান্ড আউট”। তারা লিখেছে, শেষ মুহূর্তের দুই গোল ইংল্যান্ডের স্বপ্নকে কান্নায় ভাসিয়ে দিয়েছে। দ্য ডেইলি এক্সপ্রেস লিখেছে “অনন্ত অপেক্ষার যন্ত্রণা”-র কথা, আর দ্য ডেইলি মিরর তাদের শিরোনামে লিখেছে “থ্রি লায়ন্সের বিশ্বকাপ যন্ত্রণা”। 

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো আর্জেন্টিনার এই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াকু মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। বিখ্যাত ক্রীড়া দৈনিক লেকিপ  তাদের প্রধান শিরোনাম করেছে: “দ্য ইমর্টালস” (অমর দল)। তারা লিখেছে, “ম্যাচ শেষের মাত্র পাঁচ মিনিট আগেও পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা আরও একবার কঠিন পরিস্থিতি জয় করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল। রবিবার তারা স্পেনের বিরুদ্ধে নিজেদের মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবে।” একইভাবে লে ফিগারো স্পোর্ট মেসির চিরন্তন নেতৃত্বের প্রশংসা করে লিখেছে: “বিশ্বকাপ ২০২৬: চিরসবুজ মেসির ডানায় ভর করে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা।”

আমেরিকান গণমাধ্যমেও এই ম্যাচের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট স্পোর্টস তাদের শিরোনামে লিখেছে: “যেন তারা কখনোই কোথাও যায়নি”—যা বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার আধিপত্যের ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক পোস্ট স্পোর্টস ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার স্মৃতি উস্কে দিয়ে এক কালজয়ী শিরোনাম করেছে, “দ্য হেড অব গড! (ঈশ্বরের মাথা!) আর্জেন্টিনার আবারও ইংলিশদের হৃদয়ভঙ্গ। এবার মাথার ব্যবহারে।” ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের সাথে তুলনা করে তারা লাউতারোর হেডের প্রশংসা করেছে।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমগুলো দুই মহাদেশীয় ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার এই ফাইনালকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছে। মার্কা একে “বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ফাইনাল” হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছে, “গর্ডন ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিলেও এনজো ও লাউতারো পাশা উল্টে দেন। মেসির দুটি অ্যাসিস্ট; তিনি তাঁর দ্বিতীয় তারকার খোঁজে নামবেন... ঠিক স্পেনের মতোই।” এএস লিখেছে: “ফাইনালিসিমা। আর্জেন্টিনার সবসময় একটি অতিরিক্ত জীবন থাকে: নিউ ইয়র্কে স্পেনের মুখোমুখি হতে আরও একটি সাহসী প্রত্যাবর্তন।”

কাতালান সংবাদমাধ্যম মুন্ডো দেপোর্তিভো একে “ব্রুটাল ফাইনাল” আখ্যা দিয়ে লিখেছে, মেসি আলবিসেলেস্তেদের আরও একটি খাদের কিনারা থেকে টেনে তুললেন। স্পোর্ট লিখেছে, “পাগলাটে ফাইনাল! যে ম্যাচটি আর্জেন্টিনা হেরেই যাচ্ছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা ফাইনালে।” বার্সেলোনার সাবেক তারকা মেসির স্মৃতিচারণ করে ল’এসপোর্লিউ লিখেছে, মেসির দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে শেষ মুহূর্তে ইংল্যান্ডের দুর্বলতার ফায়দা তুলেছে আর্জেন্টিনা।

ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলো ইন্টার মিলানের স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলের ওপর আলো ফেলেছে। লা গাজ্জেত্তা দেল্লো স্পোর্ট শিরোনাম করেছে: “লাউতারো অব গড” (ঈশ্বরের লাউতারো)। তারা লিখেছে, “মেসির দুই অ্যাসিস্ট এবং ইন্টার স্ট্রাইকারের জয়সূচক গোলের পর কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য এক অবিশ্বাস্য রূপ নিয়েছে।” কুরিয়ারে দেল্লো স্পোর্ট লিখেছে, “'হ্যান্ড অব গড'-এর ৪০ বছর পর ৯২ মিনিটে ‘এল তোরো’র (লাউতারো) হেডারে ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের পতন।” ইল মাত্তিনো কোচ টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দলের সমালোচনা করে লিখেছে, গর্ডনের গোলের পর টুখেলের ইংল্যান্ডকে মাঠের ভেতর চেনাই যাচ্ছিল না।

নাইজেরিয়ার পাঞ্চ স্পোর্টস এক্সট্রা লিখেছে, “মেসির আনন্দ, লায়ন্সদের বেদনা!”। মেক্সিকান গণমাধ্যম মাঠের ভেতরের ফুটবলের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে ইঙ্গিত করে শিরোনাম করেছে: “মেসি এগেইন্সট দ্য ওয়ার্ল্ড (বিশ্বের বিরুদ্ধে মেসি)”। তারা উল্লেখ করেছে যে, মাঠের ভেতর যখন মেসি সব প্রতিকূলতার জবাব দিচ্ছিলেন, তখন মাঠের বাইরে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দাবি সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন ম্যাচটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কাতারের গুলফ টাইমস স্পোর্টস সংক্ষিপ্ত কিন্তু কড়া শিরোনাম করেছে: “শেষ মুহূর্তের প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডের বুক ভাঙল আর্জেন্টিনা।”