আটলান্টা স্টেডিয়ামে বুধবার রাতে যে চিত্রনাট্য রচিত হলো, তা ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে লেখা থাকবে অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে। দীর্ঘ ৬০ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে টমাস টুখেলের শিষ্যরা বিশ্বকাপে পা রেখেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত ফিকে হয়ে গেল আর্জেন্টিনার অদম্য লড়াইয়ের কাছে। ২-১ ব্যবধানের এই পরাজয় কেবল একটি সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নয়, বরং এটি যেন ইংল্যান্ডের চিরচেনা সেই ‘কাছে গিয়েও ফিরে আসা’র এক নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি।
ম্যাচের অধিকাংশ সময় ইংল্যান্ড যেভাবে খেলেছিল, তাতে মনে হচ্ছিল তারা দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোল যখন দলকে এগিয়ে দিল, তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার ইংলিশ সমর্থকের মনে জেগেছিল ফাইনালে ওঠার অদম্য আশা। তবে মেসিদের এই আর্জেন্টিনা এভাবেই চাপে ঘুরে দাঁড়াতে পটু। আর তাতেই নাটকীয় পতন। কোচ টমাস টুখেলের রক্ষণাত্মক কৌশল এবং দলের হঠাৎ গুটিয়ে যাওয়ার মানসিকতা কি তবে ইংল্যান্ডের স্বপ্নের পথে কাল হয়ে দাঁড়াল?
ম্যাচ শেষে হ্যারি কেইনের কণ্ঠে ঝরল সেই তীব্র আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘ম্যাচের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা আমরা দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম। প্রতিপক্ষকে উচ্চচাপের মুখে ফেলে আমরা বল দখল করেছি। কিন্তু ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা মনে হয় রক্ষণ সামলাতে গিয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে গেছে, আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।’
এই জড়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলল বল পজিশনের পরিসংখ্যানেও। ইংল্যান্ডের এই পরাজয়ের কারণ কেবল ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং ছিল কৌশলগত বিপর্যয়। গর্ডনের গোলের পর থেকে লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮ মিনিটে ইংল্যান্ডের পজেশন ছিল মাত্র ১২ শতাংশ! টুখেল রক্ষণভাগ সামলাতে গিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের ছক সাজিয়েছিলেন, কিন্তু তা আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে দেয়াল হওয়ার বদলে যেন তাদের জন্য রাস্তা খুলে দিয়েছিল। মেসি যখন ডান প্রান্তে সরে এসে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন, তখনই ইংলিশদের ডিফেন্স লাইন হয়ে পড়ল দিশেহারা।
টুখেল অবশ্য পরাজয়ের দায়ভার নিজের কাঁধেই নিয়েছেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে যাওয়ার পর রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিলাম, যা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আর্জেন্টিনা তখন কোনো ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছিল না, কিন্তু আমরা ভয়ে ছিলাম কী হারাতে পারি তা নিয়ে। কোচ হিসেবে যেকোনো সিদ্ধান্তের দায় আমারই। যদি পরিকল্পনা কাজ না করে, তবে তার দায় কোচের ওপরই বর্তায়।’
ইংল্যান্ডের হারের পেছনে কোনো ‘অভিশাপ’ বা অলৌকিক কিছু দেখছেন না টুখেল। তার মতে, ‘আমি ফুটবলকে ফুটবল হিসেবেই দেখি। এগুলো আলাদা আলাদা ম্যাচ, ভিন্ন কোচ ও ভিন্ন পরিস্থিতি। আমার বিশ্বাস এটি কেবলই মাঠের কৌশলগত লড়াই।’ কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, টুখেল যে সাহসের পরিচয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেমিফাইনালের চাপের মুখে তিনি নিজেই সেই রক্ষণাত্মক চক্রে আটকা পড়েছিলেন, যা একসময় গ্যারেথ সাউথগেটের সময়ে ইংল্যান্ডকে ভোগাত।
থ্রি লায়ন্সদের জন্য এই পরাজয় সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণাদায়ক, কারণ তারা এত কাছে গিয়েও হোঁচট খেল আর একবার। তারা যে বিশ্বকাপ জয়ের সক্ষমতা রাখে, তা পুরো টুর্নামেন্টেই প্রমাণ করেছে। কিন্তু নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গিয়ে যে মানসিক জড়তা এবং রক্ষণাত্মক মনোভাব তাদের পেয়ে বসে, তা যেন এক বৃত্তের মতো বারবার ফিরে আসে।
ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রধান মার্ক বুলিংহাম ইতিমধ্যে টুখেলের ওপর আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২০২৮ সালের ইউরো পর্যন্ত টুখেলই দলের দায়িত্বে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন টুখেলের ওপর আস্থা রাখলেও, এই পরাজয়ের রেশ সহজে কাটবে না। এখন তাদের সামনে কেবল ফ্রান্সের বিপক্ষে সান্ত্বনার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। কিন্তু সেই ম্যাচে জয় পেলেও কি মুছবে সেমিফাইনালের সেই দগদগে স্মৃতি?
এই মুহূর্তে সেই ভবিষ্যৎটা ভাবার মতো অবস্থাতেও যেন নেই ইংলিশ সমর্থকরা। তাদের মনে কেবলই একটি প্রশ্ন আবার কবে এমন সুযোগ আসবে? দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষা কি তবে আরও দীর্ঘায়িতই হতে থাকবে? আটলান্টার সেই রাতে ইংল্যান্ডের হৃদয় ভাঙার শব্দ হয়তো ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে গেছে। মেসি ও তার আর্জেন্টিনা যখন ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ইংল্যান্ডকে তখন ফিরতে হচ্ছে সেই পুরনো ক্ষত নিয়ে। ফুটবলের এই নিষ্ঠুরতম রূপটিই বারবার ইংল্যান্ডের স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, আর কোটি সমর্থক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘আর একটু হলেই তো হতো!’