প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে সবাই যখন নিখুঁত পরিকল্পনা বা কৌশলকে এগিয়ে রাখেন, তখন লিওনেল স্কালোনি হাঁটছেন ভিন্ন পথে। তার বিশ্বাস আর্জেন্টিনা দলের আসল রূপ বেরিয়ে আসে তখনই, যখন তাদের পিঠ ঠেকে যায় দেওয়ালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে শেষ সময়ে নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা, তা যেন কোচ স্কালোনির এই দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন।
ইংল্যান্ড যখন ৫৪ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে গেল, আটলান্টা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন গগনবিদারী ইংলিশ গর্জন। তখন মনে হয়েছিল আলবিসেলেস্তেদের ফাইনাল স্বপ্ন বুঝি সেখানেই শেষ। তবে মাঠের ভেতরে মেসির আর্জেন্টিনা তখন এক নীরব শান্ত সমাহিত সমুদ্র। যেন তারা জানত, চূড়ান্ত ঝড়ের আগে এই নিস্তব্ধতাই তাদের মূল শক্তি। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের রকেটের মতো সেই শট আর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক হেড যেন ছিল সময়ের অপরিহার্য লিখন। ইতিহাস সাক্ষী দিল, যখনই আর্জেন্টিনা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর লড়ে, তখনই তারা রূপ নেয় অপ্রতিরোধ্য এক শক্তিতে।
ম্যাচপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন সংবাদ সম্মেলনে এলেন, তার চোখেমুখে তখন এক রাজ্যের ক্লান্তি, তবে হৃদয়ে ছিল অগাধ প্রশান্তি। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আমি সত্যি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এই দলটা আমাকে প্রতিনিয়ত অবাক করে। মাঠে তারা যা প্রদর্শন করেছে, তা সাধারণ কোনো ফুটবল ব্যাখ্যায় বোঝানো অসম্ভব। আমরা অনন্য, এটা অহংকার নয়; বরং হৃদয়ের গভীর থেকে বলা কথা। এই জয় আমাদের দেশের মানুষের জন্য এক অমূল্য উপহার।’
মাঠের লড়াইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় চরিত্র লাউতারো মার্তিনেজ। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসকে জানালেন তার সেই স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি ম্যাক অ্যালিস্টারকে বলেছিলাম আমি গোল করব। আমি জানি এই দলটা কী দিয়ে তৈরি। ইংল্যান্ড ৬০ মিনিট পর্যন্ত প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিল, কিন্তু এরপর তাদের শরীরের ভাষা বলে দিচ্ছিল তারা ক্লান্ত। আর সেই সুযোগটাই আমরা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছি।’
আর্জেন্টিনার সাফল্যের এই যাত্রায় কেবল গোল বা জয়ই মুখ্য নয়; এর পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত অটুট বন্ধন। লিওনেল মেসি, যিনি ফুটবলের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও এখনো সেই ছোটবেলার অদম্য কৌতূহল নিয়ে খেলছেন, তার কণ্ঠে শোনা গেল পরম তৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংগীতের সময় যে স্পন্দন আমরা অনুভব করছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা কেবল আরেকটি জয় ছিল না। যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে, আমরা কখনোই বিশ্বাস হারাইনি। দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা আমাদের পরিশ্রম আর একতার ফসল।’ ইংল্যান্ড ম্যাচের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আর সাম্প্রতিক উত্তাপ নিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরনের ‘পবিত্র জেদ’ কাজ করছিল। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ যেমন বললেন, ‘আমরা ভক্তদের অনুভূতির কথা জানি, কিন্তু আমাদের কাছে এটা ছিল কেবল একটি সেমিফাইনাল। আমরা ফুটবল খেলেছি, রাজনৈতিক চাপ নয়।’
অন্যদিকে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও কুটি রোমেরো সমালোচকদের কড়া জবাব দিতে কার্পণ্য করেননি। গ্যারি নেভিলের সমালোচনার জবাবে রোমেরো বেশ ঝাঁজালো কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা মাঠে কথা বলি। অবসর নেওয়ার পর আমি যেন নেভিলের মতো বোকা না হয়ে যাই যে শুধু অন্যদের সমালোচনা করব!’ আর্জেন্টিনার এই জয়ে ছিল আবেগ ও পেশাদারিত্বের এক দারুণ সমন্বয়। দলকে সমতায় ফেরানো এনজো নিজের গোল নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘আমি ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু ঈশ্বর আজ আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। আমি সেই পুরনো ‘ছোট এনজো’কে খুঁজে পেয়েছি, যে স্বপ্ন দেখত জাতীয় দলের হয়ে খেলার।’ আর্জেন্টিনার এই স্কোয়াডকে স্কালোনি অভিহিত করেছেন ‘রোঁয়া খেলোয়াড়’ বা জেদি যোদ্ধা হিসেবে। তিনি জানান, তার দলের খেলোয়াড়রা ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল পরিবেশে বড় হয়েছে, তাই ভয়ের চেয়ে লড়াইয়ের নেশাই তাদের ভেতর বেশি কাজ করে। এমনকি সেমিফাইনালের মতো ম্যাচেও তারা ভুল করার ভয় পায় না, বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল পায়ে রাখার সাহস দেখায়। স্কালোনির ভাষায়, ‘আমি গর্বিত কারণ আমার ছেলেরা শেষ পর্যন্ত লড়েছে। আমরা ফাইনালে শিরোপা জয়ের জন্য সবকিছু উজাড় করে দেব।’ রবিবার নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে যখন স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে নামবে আর্জেন্টিনা, তখন শক্তির বিচারে হয়তো অনেক সমীকরণ থাকবে। কিন্তু স্কালোনির আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা কেবল ১১ খেলোয়াড়ের দল নয়, তারা এক অবিচ্ছেদ্য পরিবার। বিশ্ব ফুটবল এখন এক নতুন পাঠ শিখল। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই ভয় পাওয়ার বদলে আর্জেন্টিনা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তার সাক্ষী রইল আটলান্টার রাত। এখন বাকি কেবল শেষ অধ্যায়।