প্রত্যাবর্তনের নাম আর্জেন্টিনা বিশ্বাসের নাম মেসি

হোয়াট এ কামব্যাক! হোয়াট এ ম্যাচ। এমন ম্যাচও জেতা যায়। এটা কেবল আর্জেন্টিনা ও মেসির পক্ষেই সম্ভব। এই ম্যাচ দেখার পর এখন বলাই যায়, এবারের বিশ্বকাপটাও মেসিরা জিতলে অবাক হব না। আরও একবার মেসির হাতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা দেখতে এখন উদগ্রীব হয়ে আছেন কোটি কোটি সমর্থক।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বড় দলগুলোর আসল পরিচয় মেলে প্রতিকূল মুহূর্তে। যারা পিছিয়ে পড়েও মাথা ঠা-া রাখে, নিজেদের ফুটবলীয় দর্শনে অটল থাকে এবং সুযোগ এলেই প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেয়, তারাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লেখে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল জয় আমাকে সেই পুরনো আর্জেন্টিনার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে, যে দল কখনো হার মানতে শেখেনি।

মিসরের বিপক্ষে নাটকীয় জয়, এরপর সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, এসব ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল চরিত্রের পরীক্ষা। প্রথমে পিছিয়ে পড়ার পর অনেক দলই ছন্দ হারিয়ে ফেলে। অথচ আর্জেন্টিনা ঠিক উল্টোটা করেছে। গোল হজম করার পর তাদের মধ্যে আতঙ্ক নয়, বরং জয়ের ক্ষুধা আরও বেড়ে গেছে। এই মানসিকতাই চ্যাম্পিয়নদের আলাদা করে।

এই আর্জেন্টিনা কেবল প্রতিভার ওপর নির্ভর করছে না, তারা বিশ্বাস নিয়ে খেলছে। খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা দেখলেই বোঝা যায়, কেউই হাল ছাড়তে রাজি নয়। একজনের ভুল অন্যজন ঢেকে দিচ্ছে, একজনের দৌড় আরেকজনকে অনুপ্রাণিত করছে। এটাই একটি সফল দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অবশ্যই এই গল্পের কেন্দ্রে আছেন লিওনেল মেসি। বয়স বাড়ছে, কিন্তু তার ফুটবলীয় মস্তিষ্ক যেন আরও পরিণত হচ্ছে। তিনি হয়তো আগের মতো প্রতি মুহূর্তে পাঁচজনকে কাটিয়ে এগিয়ে যান না, কিন্তু কখন কোথায় বল ছাড়তে হবে, কখন খেলার গতি বাড়াতে হবে কিংবা কখন পুরো ম্যাচের ছন্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, এসব বিষয়ে এখনো তিনিই বিশ্বের সেরা।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অ্যাসিস্ট ছিল সেই অসাধারণ ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তার আরেকটি নিদর্শন। অনেকেই শুধু শেষ পাসটি দেখেন। কিন্তু তার আগে কীভাবে তিনি ডিফেন্ডারদের অবস্থান পড়লেন, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং কী নিখুঁতভাবে সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দিলেন, এ সবই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

মেসি শুধু একটি অ্যাসিস্ট করেননি, তিনি পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে শান্ত রেখেছেন। যখন দল চাপে ছিল, তখন তিনিই বল নিজের কাছে রেখে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আবার সুযোগ এলেই আক্রমণের সূচনা করেছেন। একজন অধিনায়কের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়া যায়?

তবে এটাও বলতে হবে, এই আর্জেন্টিনা আর শুধু ‘মেসির দল’ নয়। এই দলের প্রতিটি খেলোয়াড় নিজেদের দায়িত্ব বুঝে খেলছে। মাঝমাঠে লড়াই, রক্ষণে আত্মত্যাগ এবং আক্রমণে ধারাবাহিক চাপ, সব মিলিয়ে এটি একটি পরিপূর্ণ দল হয়ে উঠেছে।

বিশ্বকাপের শুরুতে এই দলকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কেউ বলেছিল তারা খুব ধীরগতির, কেউ বলেছিল রক্ষণে দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু নকআউট পর্বে তারা একের পর এক কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বড় টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার কোনো বিকল্প নেই।

সবচেয়ে ভালো লেগেছে একটি বিষয়, পিছিয়ে পড়ার পরও তাদের ফুটবলের ধরন বদলে যায়নি। অযথা লম্বা বল বা তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধৈর্য ধরে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। এটাই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

এখন সামনে বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেখানে প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, এই আর্জেন্টিনা জানে কীভাবে চাপ সামলাতে হয়। তারা জানে কীভাবে ম্যাচে ফিরে আসতে হয়। আর যতক্ষণ মেসি মাঠে আছেন, ততক্ষণ অসম্ভব বলে কিছু নেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতার গল্প নয়। এটি আত্মবিশ্বাস, ঐক্য এবং বিশ্বাসের গল্প। এটি সেই আর্জেন্টিনার গল্প, যারা বারবার প্রমাণ করে, চ্যাম্পিয়নরা কখনো সহজ পথ বেছে নেয় না, তারা কঠিন পথেই নিজেদের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

আর যদি ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের দিকেই হাসে, তাহলে এই সেমিফাইনালের প্রত্যাবর্তনকেই হয়তো সবাই মনে রাখবে সেই মুহূর্ত হিসেবে, যখন আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকে জানিয়ে দিল, তাদের হৃদস্পন্দনের নাম লড়াই, আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক লিওনেল মেসি।