ফ্রান্স-ইংল্যান্ডের ‘না’ চাওয়ার ম্যাচ

বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি দলই স্বপ্ন দেখে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার। কিন্তু সেই স্বপ্নের দৌড়ে একদম শেষ দুয়ারে এসে হার মানলে গন্তব্য হয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, যা ফুটবলারদের কাছে অনেক সময় ‘অপ্রত্যাশিত দায়বদ্ধতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ শনিবার মায়ামির স্টেডিয়ামে যখন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে খেলোয়াড়দের মানসিক ক্লান্তি আর হতাশার গল্পটাই যেন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালের সেই তীব্র যন্ত্রণার রেশ এখনো কাটেনি, তার মাঝেই তাদের লড়তে হচ্ছে ব্রোঞ্জ পদকের জন্য। মানসিকভাবে ম্যাচটি খেলার যেন কোনো ইচ্ছাই নেই কোনো দলের। এমন কথার রেশ ধরে ইংলিশ কোচ টমাস টুখেল সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছেন নিজের দলের মনের কথা। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে নাটকীয়ভাবে ২-১ গোলে হেরে ফাইনাল স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে টুখেল বলেন, ‘আমাদের কোনো খেলোয়াড়ই এই ম্যাচ খেলতে চায় না, ফ্রান্সের খেলোয়াড়রাও চায় না। সবাই ফাইনাল খেলতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা সবকিছু দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন আমাদের এই ম্যাচ খেলতে হবে। ফ্রান্সের তুলনায় আমরা একদিন কম বিশ্রাম পেয়েছি, তবুও পেশাদারত্বের সঙ্গে ম্যাচটি খেলব।’

টুখেলের এই অস্বস্তির কারণ স্পষ্ট। একটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে সরাসরি ব্রোঞ্জ মেডেলের ম্যাচে নামা খেলোয়াড়দের জন্য মানসিকভাবে ভীষণ কঠিন। একদিকে দীর্ঘ টুর্নামেন্টের ক্লান্তি, অন্যদিকে ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনা সব মিলিয়ে কার্যত এই ম্যাচটি যেন তাদের কাছে এক ‘অনাকাক্সিক্ষত বোঝা’।

অন্যদিকে ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে বিষাদের সুরটা আরও গভীর। পুরো আসরে রাজত্ব করে আসার পর সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এটিই হতে যাচ্ছে লেস ব্লুসদের কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশমের শেষ ম্যাচ। ১৪ বছরের দীর্ঘ সফল এক অধ্যায়ের ইতি ঘটতে যাচ্ছে এই ম্যাচ দিয়েই। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর ২০২২ সালের রানার্সআপ কোচ হিসেবে দেশম ফরাসি ফুটবলে যে স্থায়িত্ব ও সাফল্য এনেছেন এটি হতে যাচ্ছে তার শেষ বিদায়ী উপলক্ষ। যদিও ট্রফি নিয়ে ফেরা হলো না, তবুও বিদায়ী এই ম্যাচটি কোচকে জয় উপহার দিয়ে স্মরণীয় করে রাখতে চাইবে এমবাপ্পেরা।

তাত্ত্বিকভাবে এই ম্যাচটি গুরুত্বহীন মনে হলেও ব্যক্তিগত অর্জনের লড়াইয়ে এটি বেশ আকর্ষণীয়। ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের দিকে নজর থাকবে সবার। চলতি আসরে ৮ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করা এই তারকা গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে এখনো টিকে আছেন মেসির ঠিক পরের অবস্থানে থেকেই। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি গর্ডনের মতো তরুণ তুর্কিরা চাইবেন নিজেদের শেষটা রাঙিয়ে নিতে।

মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও বড় টুর্নামেন্টের উত্তেজনায় ফ্রান্সের পারফরম্যান্স বরাবরই সমীহ জাগানিয়া। দুই দল এখন পর্যন্ত ৩২ বার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ইংল্যান্ড জিতেছে ১৭টি ম্যাচ এবং ফ্রান্স ১০টি, ড্র হয়েছে ৫টি ম্যাচ। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ পুরনো ও রোমাঞ্চকর। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিতেছিল ২-০ গোলে, আবার ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ইংলিশরা জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। তবে সবশেষ বড় মঞ্চের সাক্ষাতে ২০২২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ২-১ গোলে হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে।

শনিবারের এই ম্যাচে দুই দলই তাদের একাদশে বড় ধরনের রদবদল আনতে পারে। ফ্রান্সের উইলিয়াম সালিবা চোটের কারণে থাকছেন না। টুখেল ও দেশম উভয়েই চাইবেন টুর্নামেন্ট জুড়ে যারা সাইডলাইনে বসে ছিলেন, তাদের সুযোগ দিতে। ইংল্যান্ডের জন্য এই ম্যাচটি মান রক্ষারও বটে। কারণ এর আগে দুবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে (১৯৯০ ও ২০১৮ বিশ্বকাপ) খেলে দুবারই হেরেছে তারা। আরেকটি হার তাদের ইতিহাসের পাতায় এক অনাকাক্সিক্ষত রেকর্ডের অংশীদার করবে।

টুখেল অবশ্য দলের সমালোচনা ও সেমিফাইনালে তার কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে হওয়া বিতর্কের মধ্যেই এই ম্যাচকে দেখছেন আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সেরা চার পর্যন্ত আসাটা এই ইংল্যান্ড দলের জন্য একটি বড় সাফল্য। কিন্তু সমালোচকদের মতে, মাঠের বাইরের এই হিসাব-নিকাশ যখন মাঠের ভেতরে কৌশলে প্রতিফলন ঘটায় না, তখনই বিপর্যয় ঘটে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই বিপর্যয়ই তাদের ফাইনাল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

মায়ামিতে ম্যাচটি যখন শুরু হবে, তখন হয়তো দুই দলের খেলোয়াড়দের চোখে থাকবে অন্য কোনো গন্তব্য বা ফেলে আসা ফাইনালে যাওয়ার আক্ষেপ। কিন্তু মাঠের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পেশাদারত্বকেই প্রাধান্য দিতে হবে। ফ্রান্সের জন্য এটি হতে যাচ্ছে একটি যুগের সমাপ্তি আর ইংল্যান্ডের জন্য ক্ষত সারানোর শেষ চেষ্টা।