মন্ত্রীদের অতিকথনে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী

মন্ত্রীদের অতিকথনে বিব্রত এবং ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর একাধিকবার মন্ত্রীদের কথা কম বলার নির্দেশনা দিলেও কেউ কেউ তা মানছেন না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী। সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এক মন্তব্য উসকে দেয় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ। রাস্তায় নেমে তাদের আন্দোলন-প্রতিবাদের ঘটনায় বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরক্ত হয়েছেন। তার নির্দেশে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী কথা কম বলে কাজ বেশি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজেও কথা কম বলছেন এবং কাজ বেশি করছেন। তার সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে চলছি। মন্ত্রিসভার কেউ কেউ বেশি কথা বলছেন। বেশি কথা বললে ভুল হতে পারে। তাই প্রধানমন্ত্রী কথা বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন।’

সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েকজন মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যে সরকার বেকায়দায় পড়েছিল। বিশেষ করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের অতিকথন ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। অতিকথনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কম যাননি। এদিক থেকে আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুবই সতর্কতার সঙ্গে কথা বলছেন। তার বক্তব্য নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সমালোচনা হয়নি। বরং দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন। অথচ দুই-চারজন মন্ত্রীর জন্য সরকার বেকায়দায় পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য তাদের কাজ দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করতে পারেননি। সরকার তো দূরের কথা জনগণের কাছে তাদের নিজেদের ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করেছেন।’   

সম্প্রতি টানা ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিদ্রুপ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি মন্তব্য ক্ষোভ আরও উসকে দেয়। তার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে রাজপথে অবস্থান নেন পরীক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদে নিজের মন্তব্যর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী।

এরই মধ্যে গত বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালিবিধির ৭১ বিধিতে উত্থাপিত এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিসের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশবাসীকে মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে এবং ফুলহাতা শার্ট ও লম্বা পায়জামা বা লুঙ্গি পরার পরামর্শ দেন। মন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। নিয়মিত মশা নিধনে স্প্রে ও লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী মানুষকে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট পরা এবং পায়জামা বা লুঙ্গি লম্বা করে পরার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে অতিকথন বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর আগেও এমন আচরণ করেছেন। গত ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে চিকিৎসকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা তুলে ধরতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী নিষেধ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ ধরনের অতিউৎসাহে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর অতিকথন নিয়েও আছে সমালোচনা। তার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের এক উপদেষ্টা কৌতুক করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের দুই মন্ত্রী প্রচ- গরমেও কোট পরে থাকেন। এতে করে শরীর গরম থাকে। গরম শরীর নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলেন। তারা না বুঝলেও জনগণ তাদের এসব বক্তব্য ভালোভাবে নেয় না। কথা বলার ক্ষেত্রে তারা প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করতে পারেন।’ 

সরকার গঠনের পরপরই সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা চাঁদাবাজিকে অনেকটা বৈধতা দিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি মনে করেন, এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। কেউ জোর করে আদায় করছে না। চাঁদাবাজি নিয়ে এমন বক্তব্যে সমালোচনার মুখে পড়েন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্য অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার শামিল বলেই মনে করেন অনেকে।

বিষয়টি নিয়ে তখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন চাঁদাবাজি নিয়ে তারই মন্ত্রিপরিষদের একজনের এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক।