মেসির জন্য, লাতিন ফুটবলের জন্য

২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় সামাজিক মাধ্যমে একটি বাক্যবন্ধ লিখেছিলাম ‘আমরা ব্রাজিন্টিনা’। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল-পরাশক্তির নাম মিলিয়ে তৈরি করা ব্রাজিন্টিনা শব্দটি ছিল আমার ফুটবল দর্শনের প্রকাশ। দুই দেশের পতাকার রঙ মিশিয়ে একটি পোস্টারও বানিয়েছিলাম তখন। অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের সমর্থক আবার একসঙ্গে হওয়া যায় কীভাবে? কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি ছিল খুবই সহজ আমি কোনো একক দেশের সমর্থক নই; লাতিন ফুটবলের সমর্থক, একটি ফুটবল দর্শনের সমর্থক। 

ফুটবলের জন্ম ইংল্যান্ডে এ কথা ইতিহাসের বই বলে। কিন্তু ফুটবলের আত্মা কোথায় জন্ম নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস নয়, খেলা নিজেই দেয়। সেই উত্তর আমাদের নিয়ে যায় রিও ডি জেনেইরোর সমুদ্রতট, বুয়েনস আইরেসের শ্রমজীবী মহল্লা কিংবা মন্টেভিডিওর ছোট্ট মাঠে। সেখানে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; মানুষের সামাজিক পরিচয়, শিল্পচর্চা এবং বেঁচে থাকার ভাষা।

আমাদের প্রজন্মের ফুটবল-শৈশব শুরু হয়েছিল ব্রাজিলিয়ান মহাতারকা পেলের গল্প পাঠ্যপুস্তকে পড়ে পড়ে। ফুটবলের সেই কালোমানিকের খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু তার কিংবদন্তি আমাদের কল্পনাকে তৈরি করেছে। আর বিশ্বকাপের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘ফুটবল ঈশ্বর’ দিয়েগো ম্যারাডোনার মাধ্যমে। দূর মফস্বলে সেই সাদাকালো যুগে আবছা আবছা টেলিভিশনের পর্দায় তার বাম পায়ের জাদু দেখে মনে হয়েছিল ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের সৃজনশীলতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশগুলোর একটি।  ম্যারাডোনার কাছে বল মানে ছিল স্বাধীনতা। তিনি খেলতেন না, তিনি সৃষ্টি করতেন।

তারপর একের পর এক প্রজন্ম বদলেছে। রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা, নেইমার; অন্যদিকে বাতিস্তুতা, রিকেলমে, তেভেজ, আগুয়েরো হয়ে লিওনেল মেসি। জার্সির রঙ আলাদা, কিন্তু তাদের ফুটবলের ভাষা একই বলকে ভালোবাসা, প্রতিপক্ষকে মুগ্ধ করা, খেলাকে শিল্পে পরিণত করা। লাতিন আমেরিকা আমাদের শিখিয়েছে ফুটবল কেবল শক্তির নয়; কল্পনা, ছন্দ, আনন্দ এবং স্বাধীনতারও খেলা।

আমার কাছে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা কখনোই শুধু দুটি জাতীয় দল নয়। তারা একটি ফুটবল সভ্যতার উজ্জ্বল দুই মুখ। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, অহংকার আছে, ইতিহাস আছে; কিন্তু তাদের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় একই আত্মা লাতিন ফুটবলের আত্মা। সেই আত্মার প্রতিই আমার চিরদিনের আনুগত্য। ফুটবলকে আমি কখনো কেবল একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখিনি। এটি আমার কাছে একটি সংস্কৃতি, একটি ভাষা, একটি নন্দনতত্ত্ব। যে ফুটবলে বলের গতি শুধু গোলমুখে ছুটে যায় না, মানুষের কল্পনাকেও ছুঁয়ে যায়। যে ফুটবলে ড্রিবলিং একটি কবিতা, পাসিং একটি সিম্ফনি, আর গোল একটি শিল্পকর্মের শেষ তুলির আঁচড়। আর এটিই সর্বকালে লাতিন ফুটবলের সৌন্দর্য। যেখানে একজন খেলোয়াড়কে শেখানো হয় বলকে ভয় না পেতে, তাকে নিজের বন্ধু বানাতে। যেখানে শিশুরা একাডেমির নিখুঁত ঘাসে নয়, বস্তির গলি, সমুদ্রসৈকতের বালু কিংবা ধুলোমাখা মাঠে খেলতে খেলতে শিখে। সে কারণেই হয়তো লাতিন ফুটবলে এখনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত জন্ম নেয়। সেখানে একটি অসম্ভব পাস, একটি অদ্ভুত ড্রিবলিং কিংবা একটি অবিশ্বাস্য গোল এখনো বিস্ময় সৃষ্টি করে।

আধুনিক ফুটবল অবশ্য অন্য পথে এগিয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবল আজ বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি, তথ্য-উপাত্ত, শৃঙ্খলা, ফিটনেস এবং কৌশলের এক অনন্য সমন্বয়। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং বিশ্ব ফুটবলের মান বাড়ানোর পেছনে ইউরোপের অবদান অসাধারণ। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক ফুটবলের মধ্যেও কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মেসির পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে দেওয়া একটি পাস, রোনালদিনহোর অকারণ হাসি, তিনজনকে কাটিয়ে ম্যারাডোনার এগিয়ে যাওয়া কিংবা রোনালদোর বিস্ফোরক দৌড় এসব সংখ্যার বিষয় নয়; এগুলো অনুভূতির বিষয়।

বাংলাদেশের মানুষ কেন এত গভীরভাবে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসে, সেই প্রশ্নের উত্তরও সম্ভবত এখানেই। আমাদের সমাজও আবেগপ্রবণ, গল্পপ্রিয়, শিল্পমনা। আমরা ফলাফলের চেয়ে গল্পকে বেশি মনে রাখি। সে কারণেই হয়তো পেলের কিংবদন্তি, ম্যারাডোনার ’৮৬, রোনালদোর ২০০২ কিংবা মেসির ২০২২ এবং  আবারও প্রতীক্ষা এসব আমাদের নিজেদের জীবনের গল্প হয়ে যায়।

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের ছাদে যে হাজার হাজার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ে, সেটি নিছক সমর্থনের প্রকাশ নয়; সেটি বিশ্বায়নের ভেতরেও কল্পনার একটি ভূগোল তৈরি করার চেষ্টা। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায় অনেকের মতো আমাকেও কষ্ট দিয়েছে। কারণ ব্রাজিলের ফুটবল মানেই আমার কাছে শৈশবের রঙ। কিন্তু লাতিন ফুটবলের গল্প তখনো শেষ হয়নি। সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। আজ রাতে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে তার জাদুর দিকেই তাকিয়ে থাকব আমরা।

ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন। তরুণ লামিন ইয়ামালের নেতৃত্বে স্পেন আবারও প্রমাণ করেছে, ভবিষ্যৎ তাদের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের ফুটবলে গতি আছে, শৃঙ্খলা আছে, দৃষ্টিনন্দন সমন্বয় আছে। তারা জিতলে সেটিও হবে প্রাপ্য। তবু সব প্রাপ্যের বাইরে কিছু প্রাপ্তি থাকে, যা ইতিহাস নিজের হাতে লিখতে চায়। আমি চাই, বিশ্বকাপটি এবারও মেসির হাতেই উঠুক। কারণ এটি শুধু একজন কিংবদন্তির আরেকটি ট্রফি হবে না। এটি হবে এমন এক ফুটবল দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা, যা পৃথিবীকে শিখিয়েছে খেলা কেবল প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য নয়, দর্শককে মুগ্ধ করার জন্যও।

একদিন মেসিও চলে যাবেন। যেমন গেছেন পেলে, ম্যারাডোনা, জিকো, সক্রেটিস, রোনালদো, রোনালদিনহোরা। তারপর এগিয়ে যাবে ইয়ামাল, আসবে আরও নতুন নক্ষত্র, আরও নতুন ইতিহাস। ফুটবল তার চিরন্তন যাত্রা থামাবে না। কিন্তু প্রতিটি যুগেরই একটি শেষ কবিতা থাকে, আমার কাছে এবার সেই কবিতার নাম লিওনেল মেসি। তাই এবারের ফাইনালের আগে আমার প্রার্থনা কোনো একটি পতাকার জন্য নয়। আমার প্রার্থনা সেই ফুটবল দর্শনের জন্য, যে দর্শন আমাদের শিখিয়েছে সৌন্দর্যও একটি বিজয়।

আমি চাই ট্রফিটা উঠুক মেসির হাতে। আর্জেন্টিনার জন্য নয়, মেসির জন্যও শুধু নয়, লাতিন ফুটবলের জন্য। যদি শেষ দৃশ্যে দেখা যায় বিশ্বকাপটি সত্যিই মেসির দুই হাতে উঁচু হয়ে আছে, তবে সেটি কেবল আর্জেন্টিনার বিজয় হবে না। সেটি হবে ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করা একটি সভ্যতার জয়। আর তখন হয়তো ১২ বছর আগে লেখা সেই শব্দটি আবারও উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করবে আমরা ব্রাজিন্টিনা।

লেখক : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর