মেসি রূপকথা নাকি ইয়ামাল ছন্দ

ফুটবল গোত্র ও দর্শনের এক চূড়ান্ত মহাযুদ্ধের অপেক্ষায় বিশ্ব। একদিকে লাতিন ফুটবলের চিরচেনা ছন্দ, সৃজনশীলতা ও লড়াকু মানসিকতার প্রতিচ্ছবি আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে ইউরোপীয় আধুনিক ট্যাকটিকস আর নিখুঁত শৈল্পিক ফুটবলের ঝান্ডাধারী অপ্রতিরোধ্য স্পেন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে, তখন মাঠে মুখোমুখি হবে ফুটবলের দুই ভিন্ন প্রজন্ম, দুই ভিন্ন জাদুকর।

৩৯ বছর বয়সী ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসির সামনে সুযোগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো সোনালি ট্রফিতে চুমু খেয়ে বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানানোর। আর ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের সামনে সুযোগ ১৬ বছর পর স্পেনের ফুটবল সাম্রাজ্যকে আবারও বিশ্বের সিংহাসনে বসানোর। শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই ফাইনালটি কেবল একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি বার্সেলোনার এক রাজকীয় ব্যাটন বদলের মঞ্চও বটে।

দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বৃত্তটা যেন এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই পূর্ণতা পাওয়ার অপেক্ষায়। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে এই মাঠেই ট্রফি হারানোর বেদনায় কেঁদে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। আজ এক দশক পর, ফুটবল বিধাতা তাকে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই এনে দাঁড় করিয়েছেন এক অনন্য চূড়ায়।

এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথচলা ছিল খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিস্মরণীয় গল্প। দ্বিতীয় রাউন্ডে মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১১ মিনিটে ৩-২ ব্যবধানের জয়, কিংবা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও মেসির জাদুকরী দুটি অ্যাসিস্টে ২-১ ব্যবধানের জয় প্রমাণ করে এই দলটির ডিকশনারিতে ‘হার’ বলে কোনো শব্দ নেই। ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ম্যাচের ৭৫ মিনিটের পর। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে এই দলটির প্রধান ইউএসপি হলো তাদের ভয়ডরহীন কলিজা এবং অধিনায়কের জন্য নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা। আনহেল ডি মারিয়ার অনুপস্থিতিতে মেসি এখন রাইট হাফ-স্পেস থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের রক্ষণকে তটস্থ রাখছে, যা এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা লাউতারো মার্তিনেজদের জন্য তৈরি করছে অবারিত সুযোগ। ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে থাকা মেসির জন্য এই ফাইনালটি হতে যাচ্ছে অমরত্বের শেষ ধাপ।

অন্যদিকে স্পেনের ফুটবল যেন এক আধুনিক যন্ত্র, যা মাঠে প্রতিটি নিখুঁত পাসের সাহায্যে প্রতিপক্ষকে পিষে ফেলে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর থেকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জানান দিয়েছে কেন তারা এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে গোছানো দল।

স্পেনের মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি অধিনায়ক রদ্রি, যিনি ১৯৬৬ সালের পর এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পাসের (৬৫৫টি) বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন। সঙ্গে ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সির নিখুঁত লাইন-ব্রেকিং পাসিং দলটিকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে। স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের কাউন্টার-প্রেসিং এবং দুই প্রান্তের ফুল-ব্যাক পেড্রো পোরো ও মার্ক কুকুরেয়ার অসাধারণ ওভারল্যাপিং ও উইং রোটেশন। এবারের টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে লা রোখারা। ফাইনালে আরেকটি ক্লিনশিট রাখতে পারলে বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার নতুন ইতিহাস গড়বে স্পেন।

এই ফাইনালের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সাব-প্লট হলো মেসি ও লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথ। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ইউনিসেফের এক চ্যারিটি ক্যাম্পেইনের র‌্যাফল ড্র জিতে মেসির কোলে স্থান পেয়েছিল ৬ মাসের শিশু ইয়ামাল। আজ ১৯ বছর পর, সেই ইয়ামালই মেসির রাজত্বে হানা দিতে প্রস্তুত। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে টুর্নামেন্টের শুরুতে ইয়ামালকে কিছুটা সংযত মনে হলেও, ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার উইংয়ের ব্যবহার এবং বুদ্ধিমত্তা স্পেনের আক্রমণের ধার বাড়িয়েছে। আর্জেন্টিনা যেখানে ফাইনাল থার্ডের ৪২% আক্রমণ করে সেন্ট্রাল জোন বা মাঝখান দিয়ে, স্পেন ঠিক তার উল্টো, তারা আক্রমণ সাজায় দুই প্রান্ত ব্যবহার করে। আর্জেন্টিনার ফুল-ব্যাকদের রক্ষণাত্মক দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে ইয়ামাল ও ড্যানি অলমো জুটি হবে স্পেনের প্রধান অস্ত্র।

একনজরে ফাইনাল ফ্যাক্টস ও রণকৌশল : আর্জেন্টিনার মূল শক্তি দেরিতে গোল (৭৫ মিনিটের পর ১২ গোল), মেসির একক জাদুকরী ফর্ম (৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট)। স্পেনের নিখুঁত পজিশন ও পাসিং (রদ্রি), টুর্নামেন্টের সেরা ডিফেন্স (৭ ম্যাচে মাত্র ১ গোল)।

রণকৌশল : আর্জেন্টিনার সেন্ট্রাল থার্ড ও থ্রু-বলের আধিপত্য (বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৪০টি থ্রু-বল)। স্পেনের: উইং রোটেশন, কাউন্টার-প্রেসিং এবং ফুল-ব্যাকদের (পোরো ও কুকুরেয়া) আক্রমণ।

দুর্বলতা আর্জেন্টিনার : দুই প্রান্তের রক্ষণভাগ (হজম করা ৭ গোলের মধ্যে ৫টিই এসেছে উইং বা ক্রস থেকে)। স্পেনের খামতি : ইয়ামালের শতভাগ ফিটনেসের অভাব এবং শুরুতেই গোল খাওয়ার মানসিক চাপ।

স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেল অনুযায়ী স্পেনকে ৫৯% ও আর্জেন্টিনাকে ৪১% ফেভারিট ধরা হলেও, ফুটবল রোমান্টিকরা ভালো করেই জানেন, লিওনেল মেসি যখন মাঠে থাকেন, তখন সব পরিসংখ্যান অর্থহীন হয়ে পড়ে। লাতিন আমেরিকার ইস্পাত নাকি ইউরোপের শৈল্পিক রূপকথা মেটলাইফের সবুজ ঘাসে কার তুলিতে আঁকা হবে বিশ্বজয়ের শেষ মাস্টারপিস, তা দেখার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে কোটি ফুটবল ভক্ত।