স্পেনের বিশ্বজয়, অভিনন্দন

মহাযজ্ঞের নন্দিত পরিসমাপ্তি

যুদ্ধ-বৈরিতা আর মানবতার ক্রান্তিকালের বিশ্বে তো বটেই, যে কোনো বিচারের নিরিখেই বলা যায় ভাষা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, মতাদর্শ ও ভূ-রাজনীতির বিভাজনের দেয়াল টপকে একযোগে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে বলতে গেলে সম আবেগ-উচ্ছ্বাস-উপভোগের একসুতায় গেঁথেছে। মানবিক মহাযজ্ঞের অংশীজন করার ইতিহাসের খতিয়ান খুব বিস্তৃত নয়। বিশ্বকাপ ফুটবল একটি আলোময় অধ্যায়। ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলের ২০২৬ সালের যে বর্ণময়-ছন্দময়-রূপময় যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই বৈচিত্র্যময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল বাংলাদেশ সময় ১৯ এপ্রিল রাতের প্রায় শেষলগ্নে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, ৪৬ বছর পর স্পেনের বিশ্বজয়ের মুকুট অর্জনের মধ্য দিয়ে। আমরা অভিনন্দন জানাই বিশ্বজয়ী স্পেনকে এবং একই সঙ্গে এও বলি, সার্বিকভাবে সুনিয়ন্ত্রিত ও পেশাদার ফুটবলেরই জয় হয়েছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রকৃত শক্তি যে কেবল অর্থ নয়, আবেগ এর অন্যতম অনুষঙ্গ এবং বাংলাদেশ এরই এক বিশেষ দৃষ্টান্ত। মাঠের আয়োজনে অংশীজন না হয়েও দেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্র ফুটবলপ্রেমীদের নির্ঘুম রাত কাটিয়ে নান্দনিকতা উপভোগে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার উচ্ছ্বাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা অনুতাপ সংযোজন করলেও সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সৃজনের, আনন্দময় সমাগমের যে উপাখ্যানের অংশীদার করে নির্মল আনন্দে মাতিয়েছে দেশবাসীকে; এই শুভবোধের আলোই আমাদের সহায়ক শক্তি হয়ে থাকুক অন্ধকার বিতাড়নে। জনপরিসরে, দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ফাইনালের মহারণ নিয়ে টুকটাক কিছু প্রশ্ন-বিতর্ক আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত পেশাদার ফুটবলেরই জয় হয়েছে, তা বলা যায় দ্বিধাহীনভাব। জয়-পরাজয়ের নানা সমীকরণ আর দর্শক-সমর্থকদের বহুমতের ছড়াছড়িও সৌন্দর্যেরই অংশ।

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অধ্যায়ের নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে এর পরিসমাপ্তি রেখে গেছে অনেক গল্প, বিস্ময় যুগপৎ স্মরণীয় মুহূর্তও। উত্তর আমেরিকার তিন দেশে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন উপহার দিয়েছে রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা, অঘটন আর নতুন নায়কও। ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকবেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, জার্মানির ফ্লোরিয়ান উইর্টজ ও জামাল মুসিয়ালা, ব্রাজিলের রাফিনিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডসের ফন ডাইক প্রমুখরা। আগেরই তারকাখ্যাত লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা হ্যারি কেইনের নান্দনিকতাও নতুন করে দর্শকদের মনে গেঁথে থাকবে। নজর কেড়েছেন প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামা স্পেনের মাইকেল ওয়াইরসাবাল, ফ্রান্সের মাইকেল ওলিসে, নরওয়ের আর্লিং হালান্ড ও মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি ও আরও কেউ। এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন এবং তিনটি বিশ্বকাপে ২২ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে। টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল নতুন দলগুলোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কেপ ভার্দে গ্রুপ পর্ব থেকেই অপরাজিত থেকে ইতিহাস গড়ে। বিশ্বকাপে সাধারণত রাজনীতি আড়ালে থাকলেও এবার এর ব্যত্যয় ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের  হস্তক্ষেপ ও ফিফার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে বাড়তি আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জোগায়।

যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ছায়া, ভূ-রাজনৈতিক মেরূকরণসহ নানা নেতিবাচক বিষয় যখন দেশে দেশে কিংবা সমাজে বিভক্তির দাগ ক্রমেই মোটা করে চলেছে তখনো ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল এই সত্যই ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে, এ যেন মানবিক মহাযজ্ঞের আলো। আমরা দেখেছি, বিশ্বকাপ মানুষের মনোযোগকে এক অভিন্ন আনন্দের কেন্দ্রে আবদ্ধ করতে সক্ষম এবং এর বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট দৃশ্যমান। বিশ্ব ক্রিকেটে আমাদের জায়গাটা কম ব্যাপ্ত নয়, কিন্তু ফুটবলে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমরা আশা করব, অনুশীলন আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ভিত্তিতে আমাদের ফুটবলকে পরিশীলিত করায় মনোযোগ বাড়বে। আমাদের জাতীয় ফুটবল দল কখনো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলতে পারেনি। তাতে আক্ষেপ না বাড়িয়ে  অদূর ভবিষ্যতে খেলার সম্ভাবনা যাতে জাগাতে পারে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ গভীর হোক সেদিকে। অনেকাংশে অতীত হয়ে পড়া আমাদের ফুটবল হোক বর্তমান-ভবিষ্যতের আরেকটি প্রত্যয়। মানবিক সংযোগের বিষয়টি গভীর থেকে গভীরতর করতে পারে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক জাগরণ। বিশ্বকাপ ফুটবল সেই তাগিদই ফের দিয়েছে। বিভাজনের রেখা মুছে ঐক্য ও সৃজনের পথ সুগম হোক।