বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে; তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণেও যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর সেবা খাতের গুরুত্ব আলাদা। কারণ এই খাতের জন্য সবসময় বিশাল কারখানা, বিপুল জমি বা বড় পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, তথ্যের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা। অর্থাৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তরুণ জনগোষ্ঠীএখানেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই সামনে আসে আমরা কি শুধু ফ্রিল্যান্সার তৈরি করব, নাকি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও তৈরি করব? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তি হিসেবে কয়েক লাখ মানুষ অনলাইনে আয় করলেও তা এখনো জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটানোর মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ব্যক্তিগত আয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় যাওয়া।
বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার দূরত্ব এখনো বড়। একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, পেশাগত ইংরেজি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে দক্ষতা এসবের অনেক কিছুই তাকে পরে শিখতে হচ্ছে। এই ব্যবধান কমাতে না পারলে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের শক্তি না হয়ে বোঝায় পরিণত হতে পারে। প্রযুক্তি খাতে এখন শুধু কোডিং জানলেই হয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক রুটিনভিত্তিক কাজ দ্রুত করে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের কর্মীকে এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে এআই ব্যবহার করতে জানতে হবে। একজন হিসাবরক্ষককে এআই-চালিত সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে, একজন ডিজিটাল মার্কেটারকে ডেটা বিশ্লেষণ করতে হবে, একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে মেশিন লার্নিংয়ের সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে। বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায়ও শিক্ষাক্রমের আধুনিকীকরণ, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল সংযোগের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ এআইয়ের যুগে শুধু প্রযুক্তি কেনা নয়; মানুষের সক্ষমতা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় কাজ।
শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি অর্থনীতি দিয়েও চলবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল কর্মসংস্থান তৈরি করা। একটি তরুণকে প্রতিদিন ঢাকায় এসে কাজ করতে হবে কেন? দ্রুতগতির ইন্টারনেট, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট কিংবা ময়মনসিংহ থেকেও আন্তর্জাতিক সেবা দেওয়া সম্ভব। এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে, গ্রাম ও মফস্বলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং তরুণদের অভিবাসনের চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর সেবা বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। ঘরে বসে বা স্থানীয় ডিজিটাল কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। তবে এ জন্য ডিজিটাল বিভাজন কমাতে হবে। শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নেওয়া যায় না। দরকার সাশ্রয়ী ডিভাইস, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, মানসম্মত ইন্টারনেট, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ। বিশ্বব্যাংকের ডিজিটাল উন্নয়ন বিশ্লেষণেও ডিজিটাল দক্ষতা, সংযোগ, সরকারি ডিজিটাল সেবা এবং তথ্য সুরক্ষাকে ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো উচ্চমূল্যের সেবা রপ্তানি। দীর্ঘদিন আমরা তুলনামূলক কমমূল্যের কাজের ওপর নির্ভর করেছি। ডেটা এন্ট্রি বা সাধারণ কল সেন্টার সেবা দিয়ে একটি শিল্পের সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেখানে থেমে থাকলে চলবে না। ভারত এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। দেশটি শুধু কম খরচের শ্রমবাজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেনি; সফটওয়্যার, পরামর্শ, গবেষণা, ক্লাউড ও বিপিও সব ক্ষেত্রেই উচ্চমূল্যের সেবা রপ্তানির সক্ষমতা তৈরি করেছে। বৈশ্বিক বিপিও বাজারে ভারতের নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিংয়ের সম্প্রসারণ দেখাচ্ছে, এই বাজার এখনো দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট শুধু কম খরচের দেশ হিসেবে প্রতিযোগিতা করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা যাবে না। একসময় অন্য কোনো দেশ আরও কম খরচে একই কাজ করতে পারে। তাই আমাদের প্রতিযোগিতার ভিত্তি হতে হবে দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, ভাষা, উদ্ভাবন ও বিশেষায়িত জ্ঞান। সরকারের নীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে করনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট, ডেটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও মেধাস্বত্বের বিষয়ে পরিষ্কার ও ব্যবসাবান্ধব কাঠামো প্রয়োজন। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কাজ দেওয়ার আগে জানতে চাইবে তার তথ্য কতটা নিরাপদ, চুক্তি কতটা কার্যকর এবং বিরোধ হলে আইনি সুরক্ষা কী। ডেটা সুরক্ষার প্রশ্নটি তাই কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার প্রশ্ন। বাংলাদেশকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি বিশ্বের ডিজিটাল শ্রমবাজারে কেবল সস্তা শ্রমের সরবরাহকারী থাকব, নাকি উচ্চমূল্যের জ্ঞানভিত্তিক সেবা রপ্তানিকারক হয়ে উঠব? উত্তরটি নির্ভর করবে আমরা শিক্ষাকে কতটা আধুনিক করি, দক্ষতাকে কতটা গুরুত্ব দিই, প্রযুক্তিকে কতটা গ্রহণ করি এবং নীতিনির্ধারণে কতটা দূরদর্শিতা দেখাই তার ওপর। একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য হয়তো কোনো পোশাক হবে না। হতে পারে একটি সফটওয়্যার, একটি অ্যালগরিদম, একটি ডিজিটাল নকশা, একটি হিসাবরক্ষণ সেবা, একটি সাইবার নিরাপত্তা সমাধান কিংবা কোনো তরুণের মেধা। সেই ভবিষ্যৎ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু দরজা খুললেই সুযোগ ঘরে ঢোকে না; তাকে গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে হয়।
লেখক : গবেষক, কলাম লেখক
drharun.press@gmail.com