ইয়ামালের আলোয় স্পেন মহাকাব্য

নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামের বিশাল গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো স্প্যানিশ সমর্থকের চোখ তখন রেফারির দিকে। আর্জেন্টিনার শেষ দিকে মরিয়া আক্রমণ কিছুটা হলেও ভয় ধরিয়ে দেয় তাদের। এর মধ্যেই বেজে ওঠে শেষ বাঁশি। স্পেনের ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে। গোলরক্ষক উনাই সিমন হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে তাকান। মাঝমাঠের সেনাপতি রদ্রি চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে উদযাপন করেন জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। লামিন ইয়ামাল ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন তার মতোই ১৯ বছর বয়সী সতীর্থ পাও কুবার্সিকে। লাল-হলুদের উল্লাসে ঢেকে যায় পুরো মাঠ। স্কোর বোর্ডে তখন মাত্র দুটি সংখ্যা স্পেন ১-০ আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই স্কোরলাইন কখনোই পুরো গল্পটা বলবে না। বিশ্বকাপ কেবল একটি গোলে লেখা রূপকথা নয়, এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, পরিপূর্ণতা এবং বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমাণও।

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে ফেররান তোরেসের করা গোলই নির্ধারণ হয় এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের ভাগ্য। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিলেন ইয়ামাল। গোল কিংবা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, বরং প্রতিপক্ষের প্রতিটি রক্ষণ পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন এই তরুণ। পর্তুগালের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচের আগের দিন ১৯ বছরে পা দেন ইয়ামাল। এর কয়েক দিনের মধ্যেই হাতে তোলেন বিশ্বকাপের স্বর্ণালি ট্রফি। যে ট্রফি ছুঁতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে খেলা ছাড়তে হয়েছে তারকা অনেক ফুটবলারকে। অথচ মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন ইয়ামাল। এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের দুটি বড় শিরোপা জয়ের বিরল কীর্তি তার।

বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান হিসাব করলে সেটি হয়তো ইয়ামালের হয়ে কথা বলবে না। পুরো আসরে গোল মাত্র একটি, অ্যাসিস্ট নেই। কিন্তু মাঠে তার উপস্থিতিই বদলে দিয়েছে স্পেনের আক্রমণের চেহারা। ডান প্রান্তে বল পেলেই দুই কিংবা তিনজন ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরেন। প্রতিপক্ষের এই বাড়তি মনোযোগই স্পেনের অন্য আক্রমণভাগকে আরও কার্যকর করে তোলে। বিশেষ করে মার্ক কুকুরেইয়া ও নিকো উইলিয়ামস সেই ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ঢুকে পড়েন।

বিশ্বকাপের আগে খেলা নিয়ে শঙ্কা ছিল ইয়ামালের। সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে বার্সেলোনার হয়ে মৌসুমের শেষ দুই মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। এ জন্য স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেন এই তরুণ তুর্কিকে। আট ম্যাচে ৪৯৫ মিনিট মাঠে ছিলেন। এই সীমিত সময়ে ২২টি সফল ড্রিবল, ছয়টি কী-পাস, ৮২ শতাংশ সফল পাস করেন এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে একটি গোল করেন তিনি। শেষ ষোলোর ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে আদায় করেন গুরুত্বপূর্ণ একটি পেনাল্টিও।

ইয়ামালের পাশাপাশি স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বে দলগত মহাকাব্যও লেখা হয়েছে। এই ভিত গড়ে দেওয়ার অন্যতম কারিগর রদ্রি। পুরো টুর্নামেন্টে নিজের পায়ে রাখেন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ সফল পাস, ২২টি ট্যাকল, ৩৪ বার প্রতিপক্ষের পা থেকে বল ছিনিয়ে নেওয়া এবং ১১টি ক্লিয়ারেন্স-পরিসংখ্যানই বলে দেয় তার প্রভাব কতটা। সংখ্যার বাইরেও ছিল তার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়ার দক্ষতা। ফাইনালে লিওনেল মেসিকে ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার নেপথ্যেও ছিল রদ্রির কৌশল। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতাটা স্পেন অধিনায়কের প্রাপ্য স্বীকৃতি।

রক্ষণভাগে স্পেনের নতুন আবিষ্কার পাও কুবার্সিও উজ্জ্বল ছিলেন। ১৯ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই যে পরিণত ফুটবল তিনি উপহার দেন, তা বিস্ময় জাগানোর মতো। নিখুঁত ট্যাকল, দুর্দান্ত পজিশনিং দক্ষতা এবং চাপের মুহূর্তে ঠা-া মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে স্পেনের অন্যতম ভরসায় পরিণত করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছেন সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কার।

স্পেনের বাঁ প্রান্তে নিরলস ছুটেছেন মার্ক কুকুরেয়া। নিকো উইলিয়ামস পুরোপুরি ফিট না থাকায় অনেক ম্যাচেই আক্রমণে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়েছে তাকে। বাইলাইন ধরে দৌড়, নিখুঁত কাটব্যাক, কার্যকর ক্রস এবং মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণে ফিরে আসা-পুরো আসরেই তিনি ছিলেন দলের অন্যতম পরিশ্রমী খেলোয়াড়। ইয়ামালকে ঘিরে প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত মনোযোগের সুযোগ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগান তিনি।

গোলপোস্টের নিচে উনাই সিমন ছিলেন স্পেনের শেষ ভরসা। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র থেকে শুরু করে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে খালি হাতে ফিরিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করে জেতেন গোল্ডেন গ্লাভস। বিশ্বকাপজয়ী দলের গোলরক্ষকদের ইতিহাসে এটিও অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

স্পেনের শিরোপা জয়ের পথটাও ছিল দারুণ। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সৌদি আরবকে ৪-০, উরুগুয়েকে ১-০, অস্ট্রিয়াকে ৩-০, পর্তুগালকে ১-০, বেলজিয়ামকে ২-১, ফ্রান্সকে ২-০ এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে তারা। অথচ পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে স্পেন। এই দলের সবচেয়ে আলোচিত নাম ইয়ামাল। ভবিষ্যতের স্পেনের প্রতীকও তিনি।

ফিফার অফিশিয়াল ফাইনাল থার্ড এন্ট্রি পরিসংখ্যান বলছে, ইয়ামালের প্রভাব ছিল ম্যাচভেদে ভিন্ন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই প্রান্তই সমান কার্যকর থাকলেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ডান দিক (২৮) হয়ে ওঠে স্পেনের প্রধান আক্রমণ পথ। বিপরীতে সেমিফাইনালে ফ্রান্স ইয়ামালকে আটকে রাখতে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ায় বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৮টিতে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আবার ডান দিকেই সর্বোচ্চ ৩৭টি এন্ট্রি হয়। তাই ১ গোল ও ০ অ্যাসিস্টের বাইরে ইয়ামালের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য আক্রমণের জায়গা তৈরি করে দেওয়া।