ফুটবলের একটা খুব বাজে অভ্যাস আছে। যুক্তি বা বুদ্ধি যে প্রশ্নের উত্তর আগেই তৈরি করে রাখে, ফুটবল ঠিক সেই জায়গায় এসে হৃদয়কে এমন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যার কোনো সহজ জবাব থাকে না। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের রবিবাসরীয় ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ গোলের পরাজয় ফুটবলবিশ্বকে এমনই এক অদ্ভুত দোলাচলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে যেমন রয়েছে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর এক আবেগঘন ও রাজসিক মুহূর্ত, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে ট্রফি ধরে রাখার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার চরম নেতিবাচক, কদর্য ও আক্রমণহীন ‘অ্যান্টি-ফুটবল’ খেলার এক কালো দাগ। মেটলাইফে ম্যাচশেষে যখন স্প্যানিশরা উল্লাসে মাতোয়ারা, তখন চিরচেনা নিয়ম ভেঙে মিক্সড জোন বয়কট করেছিলেন লিওনেল মেসি। শোনা যায়, পরাজয়ের পর ড্রেসিংরুমে একা বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। বিগত দুই দশক ধরে আকাশি-সাদা জার্সিতে যিনি কোটি কোটি মানুষের হতাশা ও সংকটের উপশম করেছিলেন, ২০২৬ সালের এই ফাইনালে ঈশ্বর তাকে শেষবারের মতো ট্রফি ছোঁয়ার আনন্দ দেননি।
কিন্তু এই পরাজয়ে মেসির মহত্ব বিন্দুমাত্র মøান হয় না। ফুটবলার মেসি ঠিক এমনই এক সান্ত্বনার আশ্রয়, অবিচারের প্রতিকারকারী এবং দুঃখী আত্মাদের ত্রাণকর্তা। আর হ্যাঁ, ফুটবলের মাধ্যমেই তিনি তা করেছিলেন। ম্যারাডোনার বিশ্বকাপজয়ী সঙ্গী হোর্হে ভালদানো ফুটবলকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন ‘কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ মেসি কেবল বল পায়ে যেকোনো জার্সিতেই (শুধু আকাশি-সাদা নয়) হারিয়ে যাওয়া আত্মা, নিঃসঙ্গ হৃদয় আর কোটি মানুষের হতাশা দূর করেছেন।
এই মেসি মর্ত্যরে এক ঈশ্বর। শুনতে যতই সস্তা বা সাধারণ শোনাক না কেন, কয়েকটা প্রজন্মের জন্য তিনি ফুটবলের ঈশ্বর। আর তাই সেই প্রজন্মগুলোই তার কাছে ঋণী, মেসি এই অন্ধ আর্জেন্টাইন জনতার কাছে ঋণী নন। তার কাছে সবকিছু চাওয়া হয়েছিল এবং তিনি সাধ্যের সবটুকু দিয়েছেন। তার কাছে আর নতুন করে চাওয়ার কিছু নেই, চাওয়াটা স্রেফ বোকামি।
মেসি হওয়াটা সহজ ছিল না; নিজের কাঁধে (এবং বাঁ পায়ে) কোটি মানুষের হতাশার ভার বহন করা এবং নিজের প্রতিভা দিয়ে সেই হাজারো ন্যায্য অভিযোগের উপশম করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। যখন দলের খারাপ সময়ে, অনিয়মিত জয় আর ঘন ঘন পরাজয়ের পর তাকে নিয়ে কত আজবাজে কথা বলা হতো তিনি নাকি জাতীয় সংগীত গান না, তিনি আসলে স্প্যানিশ, জার্সির প্রতি তার টান নেই! আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তদের মনে রাখা উচিত সেসব দিনের কথা, সেই মেসিই এক পা এক পা করে, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পানি করে সবকিছু বদলে দিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সেও এই বিশ্বকাপে ক্লোসার রেকর্ড ভেঙেছেন, প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করে দলকে ফাইনালে টেনেছেন।
মেসির বিদায় যেখানে রাজসিক সম্মানের, সেখানে তার সতীর্থদের ফাইনালের পারফরম্যান্স তার এই সোনালি ক্যারিয়ারে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকল। সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে মাঠে রেখে একটি দল এতটা নি®প্রাণ ও নিস্তেজ হতে পারে না। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে তারা প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শটও নিতে পারেনি; অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১২১ মিনিটে যখন তাদের প্রথম শট আসে, তার আগেই স্পেন নিয়ে ফেলেছে ২০টি শট! এক্সপেক্টেড গোল ছিল একেবারে শূন্য (০.০০)।
পুরো ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার একমাত্র কৌশল ছিল খেলা মন্থর করা, সময় নষ্ট করা আর খেলায় বিঘœ ঘটানো। যে আর্জেন্টিনা ১৯৭৮, ১৯৮৬ বা ২০২২ সালের নান্দনিক ফাইনাল উপহার দিয়েছিল, ২০২৬-এর মঞ্চে তারা ফিরিয়ে এনেছিল ১৯৯০ সালের সেই কুখ্যাত নেতিবাচক ফুটবলকে। গতিহীন ও উইংহীন এই দলটি যে মূলত মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেই এতদিন টিকে ছিল, স্পেনের বিশ্বমানের ডিফেন্সের সামনে তা নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে। যখন তারা ফুটবলীয় স্কিল দিয়ে স্পেনের নিখুঁত পাসিং ফুটবলের সামনে টিকতে পারছিল না, তখন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা আশ্রয় নেয় চরম শৃঙ্খলাহীনতার। অতিরিক্ত সময়ে পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে এনসো ফার্নান্দেজ যখন দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, তা ছিল চরম বোকামি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কদর্য রূপটি দেখা যায় ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর। প্রথমার্ধের পর মাঠে নেমে বল ছাড়াই রদ্রিকে ধাক্কা দেওয়া আর্জেন্টিনার ‘ডার্ক প্রিন্স’ লিয়ান্দ্রো পারেদেস ম্যাচশেষে মাথা গরম করে বসেন। স্পেনের তরুণ খেলোয়াড় গাভিকে মাঠে আছড়ে ফেলে রীতিমতো ঘুষি মারার চেষ্টা করেন তিনি, যার শাস্তি হিসেবে রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। মাঠের এই বুনো আচরণ এবং পরে গণমাধ্যমকে এড়িয়ে মিক্সড জোন বয়কট করার ঘটনাটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই বেমানান ছিল।
কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচশেষে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, স্পেন তাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে। তবে এই হারের ট্র্যাজেডি হচ্ছে ফুটবল ঈশ্বরের যে বিদায়টা হতে পারত রক অ্যান্ড রোলের উৎসবের মতো আনন্দের, সতীর্থদের কুৎসিত অ্যান্টি-ফুটবল ও শৃঙ্খলাহীনতার কারণে তা শেষ হলো অতৃপ্তিতে, বিষাদময়তায়। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখবে, সতীর্থরা সহানুভূতি না পেলেও বিদায়ী ঈশ্বর মেসির জন্য ফুটবলবিশ্বের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা আজীবন অমান থাকবে। আর তার শেষ নিন্দুকদের উদ্দেশ্যে বাতাসে ভাসবে সেই চিরচেনা মোক্ষম জবাব যেটা তিনি ২০২২ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের ওয়েহর্স্টকে বলেছিলেন ‘এখান থেকে বিদায় হও, মূর্খ।’