নারী ও শিশু নির্যাতন

৫ মামলায় ৪ জনের মৃত্যুদন্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল সোমবার ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী কয়েকটি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত। মাগুরার আলোচিত স্কুলছাত্রী রাজিয়া খাতুন হত্যা মামলায় অভিযুক্তকে মৃত্যুদন্ডের সাজা শুনিয়েছে আদালত। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৯ বছরের শিশু আয়নী হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদন্ড এবং জামালপুরে নারী ও শিশু নির্যাতনের পৃথক দুটি ঘটনায় একজনের মৃত্যুদন্ড ও তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত।  এদিকে দীর্ঘ ১৪ বছর বিচারিক কার্যক্রম চলার পর ভোলার চরফ্যাশনের গৃহবধূ হুনুফা আক্তার হত্যা মামলায় স্বামী হাফিজুল হককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে এসব রায় কঠোর বার্তা দেবে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে

মাগুরা : মাগুরার শ্রীপুরে স্কুলছাত্রী রাজিয়া খাতুনকে হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় আসামি হাসান শেখ নামে এক যুবকের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৭ মার্চ শ্রীপুর উপজেলার শ্রীখোল গ্রামের স্কুলছাত্রী রাজিয়া খাতুন বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন বাড়ির পাশের কুমার নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনার দুদিন পর, ১৯ মার্চ নিহতের বাবা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে শ্রীপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেশী হাসান শেখকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) সাখাওয়াত হোসেন জানান, মামলায় ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত রায় দেয়। তদন্তে উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে ভুক্তভোগীর লাশের সঙ্গে পাওয়া একটি চুলের ডিএনএ পরীক্ষায় তা আসামি হাসান শেখের সঙ্গে মিলে যায়। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও আসামি তার অপরাধ স্বীকার করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বাড়ির পাশের রসুনক্ষেতে যাওয়ার পর থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর কুমার নদের পাড়ে শম্ভু কুন্ডুর পেঁপেবাগানের উত্তর পাশে বাঁশঝাড়ের নিচে তার লাশ উদ্ধার করেন। তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার আগে আসামি ওই শিক্ষার্থীকে স্কুলে যাতায়াতের পথেও উত্ত্যক্ত করতেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদন, আলামত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত হাসান শেখকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন।

রায় ঘোষণার পর নিহত শিক্ষার্থীর মা সবিরুন নেছা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ ছিলাম। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট এবং দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানাই।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটি জেলার একটি আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। আদালতের এ রায় শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জামালপুর : জামালপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ পৃথক দুটি মামলায় এক আসামিকে মৃত্যুদ- এবং তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছে। গত রবিবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ফজলুল হক জানান, বকশিগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর গ্রামের মো. হাফিজুল ওরফে আফজল যৌতুক না পেয়ে তার স্ত্রী হুনুফা বেগমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বকশীগঞ্জ থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে নিহতের মা আমেনা বেগম। সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত নিহতের স্বামী মো. হাফিজুল ওরফে আফজলকে মৃত্যুদ- ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর চার আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। রায় প্রদানের সময় আসামিরা উপস্থিত ছিলেন।

একই আদালত জামালপুর সদর থানার একটি অপহরণ মামলায় তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা যায়,  ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর সকালে এসএসসি পরীক্ষার্থী নূরজাহান কলি প্রাইভেটে যাওয়ার পথে শামীম, শিপন ও জালাল নামে তিন যুবক তাকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করে। পরে গাজীপুর থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

মামলায় সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত শামীম ও শিপন ও  জালালকে যাবজ্জীবন কারা-ের আদেশ দেন। এ ছাড়া দ-প্রাপ্তদের মধ্যে জালালকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে ৯ বছরের শিশু আবিদা সুলতানা আয়নীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হত্যা ও লাশ গুমের মামলায় একমাত্র আসামি মোহাম্মদ রুবেলকে মৃত্যুদ- দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার বেলা ২টার দিকে রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান। রায় ঘোষণার সময় আসামি রুবেল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানামূলে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি রায়হানুল ওয়াজেদ বলেন, মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য-প্রমাণে ধর্ষণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শিশু আয়নীকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আসামি মোহাম্মদ রুবেলকে মৃত্যুদ- দিয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২১ মার্চ নিখোঁজ হয় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়নী। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান না মেলায় তার মা নগরের পাহাড়তলী থানায় জিডি করেন। তদন্তে স্থানীয় সবজি বিক্রেতা মো. রুবেলের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের ৯ দিন পর পাহাড়তলীর মুরগি ফার্ম এলাকার একটি ডোবা থেকে আয়নীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির ব্যবহৃত পোশাক ও স্যান্ডেলও পাওয়া যায়। রুবেল খুনের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। লাশ উদ্ধারের পর আয়নীর মা চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এ নালিশি মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশ তদন্ত শেষে রুবেলের বিরুদ্ধে অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন।

ভোলা : অবশেষে বিচার মিলেছে ভোলার চরফ্যাশনের গৃহবধূ হুনুফা আক্তার হত্যা মামলার। ঘটনার দীর্ঘ ১৪ বছর পর স্বামী হাফিজুল হককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই শেষে এ রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।

গতকাল দুপুরে জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফজলুল হক।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মায়া কলমী গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম জীবিকার তাগিদে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন এবং সবজির ব্যবসা করতেন। রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি কলার আড়তে কাজ করার সময় জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর গ্রামের মৃত প্রধান মিয়ার ছেলে হাফিজুল হকের সঙ্গে তার দ্বিতীয় মেয়ে হুনুফা আক্তারের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ২০১২ সালে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। পরে দুই পরিবার বিষয়টি মেনে নিলেও বিয়ের পর থেকেই ১ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে হুনুফার ওপর নির্যাতন চালাতে থাকেন হাফিজুল। একপর্যায়ে তিনি ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জামালপুরের বকশীগঞ্জে নিজ বাড়িতে শ্বাসরোধ করে স্ত্রী হুনুফা আক্তারকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ১৯ সেপ্টেম্বর নিহতের মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে বকশীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে গতকাল আদালত আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে হাফিজুল হককে মৃত্যুদন্ড এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট ফজলুল হক এবং আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট মো. মোজাম্মেল হক।