পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপে হিমশিম সরকার

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয় জাতীয় বেতন কমিশন। ওই অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। আর নতুন পে-স্কেল চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাস্তবায়ন করতে হলে ১ লাখ ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ বছর ঘুরতেই এ খাতে পেনশনের পাওনাসহ রাষ্ট্রের খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায়। ব্যয় বৃদ্ধির এই হার ১৫৬ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরকারের পরিচালন ব্যয় ৬ লাখ কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ আগের হিসাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে ৬ লাখ কোটি টাকার সঙ্গে আরও প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যোগ করতে হবে। সেই সঙ্গে বাজেটের মোট অঙ্ক অতিক্রম করবে ১০ লাখ কোটির সীমা।

দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে ক্ষত-বিক্ষত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে একটি ঘাটতি বাজেট নিয়ে নির্বাচিত বিএনপি সরকার প্রথম অর্থবছরে পদার্পণ করেছে। তার ওপরে ১৫৬ শতাংশ ব্যয়বৃদ্ধির পে-স্কেল বাস্তবায়নের তাগিদ ও নীতিগত অবস্থান কঠিন চাপে ফেলেছে সরকারকে। সার্বিক বিষয়গুলোর হিসাব-নিকাশের জটিল সমীকরণ এখন সচিব কমিটির হাতে। এজন্যই সহসা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় উঠছে না। সচিব কমিটি থেকে মন্ত্রিসভার পথের দূরত্ব এখনো অনেক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পে-স্কেল বাস্তবায়নে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ থাকলেও সচিব কমিটি বিবেচনায় নিচ্ছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিত্যপণের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব, নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা, দেশের বিশাল বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সামর্থ্য এবং কর্মজীবীদের বিদ্যমান বেতন-ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। সাধারণত সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করলে পরদিনই নিত্যপণ্যের বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। বাড়তি দামের চাপে নাভিঃশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষের। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর চাপে পড়েন। এর সঙ্গে এবার তেল-গ্যাসের সংকট ও উচ্চমূল্য এবং বৈরী বৈশ্বিক ব্যবসা পরিস্থিতিও বেসরকারি খাতকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না শত শত উদ্যোক্তা। অসংখ্য বেসরকারি উদ্যোক্তা ব্যাংকের দায়দেনাও পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সচিব কমিটির বৈঠক করেছি। সেখানে সার্বিক আলোচনায় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা দুটি বিষয়ই সমন্বয় করার কথা এসেছে। সচিব কমিটির বেশিরভাগ সদস্য এ ব্যাপারে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। এজন্য আরও সময় লাগবে। তবে আমরা একটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছি।’

তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন বাড়েনি। সেই অর্থে এটি ‘ডিউ’ বা প্রাপ্য হয়ে গেছে। কিন্তু অর্থের সংস্থান কী করে হবে, বিকল্প কী উপায় আছে তা সচিবরা খতিয়ে দেখছেন।  

আলোচিত পে-স্কেল নিয়ে কয়েকজন সচিব ও পে কমিশনের সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারি কর্মকর্তারা বেতনের সঙ্গে দেওয়া প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে গিয়েছিলেন। কারণ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও নতুন পে-স্কেল না দিয়ে প্রথমে মহার্ঘ্য ভাতা এবং পরে সেটি প্রণোদনার আকারে দিয়ে যাচ্ছিল। অর্থ উপদেষ্টা এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলবেন বলে কিছুটা সময় নেন। পরে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে নতুন পে-স্কেল দেওয়ার কথা জানান। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ এক বছর পার না হতেই ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্যের পে কমিশন গঠন করা হয়। অথচ তখন দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের নাকাল অবস্থা ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও আমলাতোষণের নীতি গ্রহণ করে। দ্রুত পে কমিশন গঠনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুশি করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কৌশল নেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জোরালো হতে শুরু করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রবাস থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ২১ জানুয়ারি পে কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবসহ পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেলের সুপারিশ করে।

নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। এরপর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। বিপুল ঘাটতির বাজেটের মধ্যে পে-স্কেলে অর্থের সংস্থান কীভাবে করা সম্ভব তার উপায় খুঁজতে সরকার একটি সচিব কমিটিও গঠন করে দেয়। এই কমিটি গত ২৪ জুন এবং ১৫ জুলাই দুই দফা বৈঠক করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে টাকা ছাপাতে হবে। আর কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ড. ইউনূস ও ড. সালেহউদ্দিন আমাদের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি করে গেছেন। তাদের অনেক নীতি সময়োপযোগী ছিল না। এর একটি ছিল এই পে-স্কেল।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যেন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে প্রণোদনার হার বাড়ানো হয়। কিন্তু ড. সালেহউদ্দিন তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল দেওয়ার কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টা এবং অর্থ উপদেষ্টার মধ্যে কারোরই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা ভেবেছিলেন, আমলাদের সন্তুষ্ট করে বা আমলাতোষণ করেই আওয়ামী লীগের মতো ভোটবিহীন ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা যাবে।’

পে কমিশনের একজন সদস্য নামপ্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘এখন আর পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ কী! পে-স্কেল এখন অনেক পথ পেরিয়ে এসেছে। এটি বাস্তবায়নের জায়গা থেকে ফেরার উপায় নেই। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এগুলে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে।’

বিষয়টি নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কয়েক দফা ফোন করলেও তিনি ধরেননি ও খুদে বার্তাতে সাড়া দেননি।

জানা গেছে, সংকট থাকলেও প্রজ্ঞাপন যখনই হোক সরকার ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়গুলো নিরসনে সচিব কমিটিকে কাজ করতে বলা হয়েছে। পে-কমিশন চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান গত জানুয়ারিতে কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এটি কমিশনের সুপারিশমালা। চাইলে এটি পরিবর্তন করা যাবে।’