উৎসবে ইয়ামাল নীরব মেসি

নিউইয়র্কে  রবিবার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। তাদের জয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেছে আর্জেন্টিনার। একদিন পর দুদলই দেশে ফিরেছে। ১৬ বছর পর ট্রফি পুনরুদ্ধারের উৎসবে মাদ্রিদের রাজপথে যেখানে নেমেছে ২০ লাখ মানুষের লাল-সোনালি মহাসমুদ্র, ঠিক তখনই রদ্রিগো-মেসিদের আর্জেন্টিনায় বিরাজ করছে রানার্স-আপ হওয়ার নীরব বিষাদ ও ভবিষ্যতের এক বড় অনিশ্চয়তা। একদিকে সিবেলেস স্কয়ারে চ্যাম্পিয়নদের খোলা ছাদের বাসে উদযাপনের ধামাকা, অন্যদিকে জন্মশহর রোজারিওর হিমশীতল ভোরে বিষাদগ্রস্ত লিওনেল মেসির ঘরে ফেরা।

লাল-সোনালি মাদ্রিদে ২০ লাখ মানুষের মহাসমুদ্র : সোমবার বিশ্বজয়ী ‘লা রোহা’ ফুটবলাররা দেশে পৌঁছালে রাজধানী মাদ্রিদের রাস্তায় নেমে আসে উৎসবে মাতোয়ারা সাধারণ মানুষের ঢল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্পেনের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় প্রত্যক্ষ ও উদযাপন করতে মাদ্রিদের রাজপথে একত্র হয়েছিলেন অন্তত ২০ লাখ সমর্থক। পুরো স্পেনজুড়ে এই ম্যাচটি গড়ে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৬ হাজার মানুষ টিভিতে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন, যা স্প্যানিশ স্পোর্টস সম্প্রচারের ইতিহাসে অন্যতম বড় রেকর্ড।

প্লাজা দ্য সিবেলেসের মূল সংবর্ধনা মঞ্চে যাওয়ার আগে জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল সম্পন্ন করেন। ফাইনালে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকা স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ জার জুয়েলা প্যালেসে খেলোয়াড়দের অভ্যর্থনা জানান এবং ট্রফি উঁচিয়ে ধরে দলের প্রতিটি সদস্যকে অভিনন্দন জানান।

এরপর মনক্লোয়া প্যালেসে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দলটিকে সংবর্ধনা দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের খেলার শৈলী, নিখাদ পরিশ্রম এবং এই অবিস্মরণীয় অর্জনের জন্য পুরো জাতির পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ।’ এ সময় ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া পরবর্তী বিশ্বকাপে পুরুষ দলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতেই প্লাজা দ্য সিবেলেস স্কয়ার রক্তিম লাল রঙে রূপ নেয়। তীব্র গরম সত্ত্বেও হাতে ছাতা, বাঁশি আর জাতীয় পতাকা নিয়ে দুপুর থেকেই ব্যারিকেডের সামনে অবস্থান নেন সমর্থকরা। ডিজে সেশন, ড্রামসের তালে গান এবং ‘ভিভা সুয়েসিয়া’ ও সাইকোর সরাসরি কনসার্টের মধ্য দিয়ে মূল উদযাপনের আবহ তৈরি করা হয়।

খোলা ছাদের যে বিশেষ বাসটিতে ফুটবলাররা শহর প্রদক্ষিণ করেন, সেটির গায়ে লেখা ছিল বিশ্বের রাজা এবং গায়ে আঁকা ছিল দুটি উজ্জ্বল স্বর্ণালি তারা। বাসটির পেছনে লেখা ছিল : তারকারা একসঙ্গেই জ্বলে ওঠে।

বাসটি সিবেলেসে পৌঁছালে উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়। মঞ্চে উঠে তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস তাদের বিখ্যাত ডান্স মুভ তুলে ধরেন। ফরোয়ার্ড বোর্হা ইগলেসিয়াস নিজেই ডিজে কনসোলে উঠে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন, আর পপ তারকা আইতানা মঞ্চে উঠে গাইলেন স্পেনের বিশ্বকাপ থিম সং ‘সুপারএস্ত্রেয়া’।

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও অধিনায়ক রদ্রি ট্রফি হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে ফাইনালে জয়সূচক গোলদাতা ফেরান তোরেসকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আজ আমরা বিশ্বসেরা। তবে আমি এমন একজনকে বিশেষভাবে মনে করাতে চাই যিনি এতদিন অন্যায্য সমালোচনার শিকার হয়েছেন, কিন্তু আজ তিনি আমাদের ইতিহাসের অংশ আমাদের ফেরান তোরেস।

কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই গান, নাচ ও আলোর আতশবাজিতে মুখরিত মাদ্রিদ সোমবার রাতে সাক্ষী থাকল এক নতুন স্বর্ণালি ইতিহাসের।

বিশ্বজয়ের ক্ষত নিয়ে জন্মশহরে মেসি : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের ১-০ গোলের হৃদয়বিদারক পরাজয়ের পর নিজ জন্মশহর রোজারিওতে ফিরেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্বপ্নের ফাইনাল শেষে দলের সঙ্গে বুয়েনস আইরেসের এজেইজা বিমানবন্দরে না গিয়ে, পরিবারের সঙ্গে নিজস্ব প্রাইভেট বিমানে করে সরাসরি জন্মভূমিতে অবতরণ করেন ৩৮ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর।

কুয়াশা, কনকনে শীত আর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে মঙ্গলবার ভোর ৬টা ২৬ মিনিটে রোজারিওর ‘ইসলাস মালভিনাস’ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে এক নজর দেখতে ভিড় জমান শত শত ভক্ত। বিমানবন্দর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে মেসিকে নিয়ে যাওয়া হয় রোজারিওর আভিজাত্যপূর্ণ এলাকা ফুনেসের ‘কেন্টাকি কান্ট্রি ক্লাব’-এর নিজ বাড়িতে। সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তদের উদ্দেশ্যে গাড়ির ভেতর থেকেই হাত নাড়েন তিনি।

বিশ্বকাপের প্রায় ৫০ দিনের দীর্ঘ ধকল ও মানসিক অবসাদ কাটাতে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও চিরোকে নিয়ে আগামী কয়েক দিন এই নিজস্ব বাসভবনেই সময় কাটাবেন মেসি।

ফাইনালের পর মাঠ বা স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনো মন্তব্য করেননি অধিনায়ক। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্তদের উদ্দেশ্যে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন মেসি, ‘এই কষ্টের পরিমাপ করা কঠিন, এই ক্ষত শুকাতে বেশ সময় লাগবে। তবে দলের ইতিবাচক দিকগুলোও ভুলে গেলে চলবে না... মাঠের লড়াইয়ে আমরা যেভাবে জয় ছিনিয়ে এনেছি এবং পুরো দেশের সমর্থন সঙ্গে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’*

মেসি আরও লেখেন, ‘আজ হয়তো আমাদের এই অর্জনকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা কঠিন, তবে এই দলটি টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলেছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার এই গর্ব আমাদের আজীবন একসূত্রে বেঁধে রাখবে। একই সঙ্গে আমি স্পেনকে অভিনন্দন জানাই তাদের এই শিরোপা জয়ের জন্য।’

ফাইনালের পর সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দির অবসর এবং কোচ লিওনেল স্কালোনির আগামী ডিসেম্বর শেষে পদত্যাগের বার্তার পর মেসির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকা মেসি কি জাতীয় দলের জার্সিতে আর মাঠে নামবেন?

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র অনুযায়ী, ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেললেও, এখনই জাতীয় দলকে চিরতরে বিদায় জানানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি। কনমেবল এর ২০২৮ কোপা আমেরিকা ও আগামী ২০২৭ সাল থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০৩০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ট্রানজিশন পর্বে তরুণদের দিকনির্দেশনা দিতে মেসিকে দলে চান এএফএ সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়া।

এজেইজায় ‘ধন্যবাদ’ বার্তা ও বুয়েনস আইরেসে নীরব অভ্যর্থনা : মেসি ও রদ্রিগো দে পল যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে থেকে গেলেও, কোচ লিওনেল স্কালোনি ও স্কোয়াডের বাকি সদস্যরা সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় এয়ারলাইনসের বিমানে বুয়েনস আইরেসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নামার পরই দলের জন্য রানওয়েতে ১৫০ মিটার জায়গা জুড়ে বিশাল অক্ষরে লেখা ছিল- গ্রাসিয়াস (ধন্যবাদ!)**।

তবে রানার্স-আপ হওয়ার কারণে এএফএ-র পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই দেশের সরকারি ভবন ‘কা সা রোসাদা’-এর বেলকনি ব্যবহারের প্রস্তাব দিলেও, ফুটবলারদের অনুরোধেই কোনো রাষ্ট্রীয় উদযাপনে অংশ নেওয়া হয়নি। আগামী সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরের ফিফা উইন্ডোতে প্রীতি ম্যাচ এবং সম্ভাব্য ‘ফিনালিসিমা’ দিয়ে আবারও মাঠে ফিরবে আলবিসেলেস্তেরা।