২১ জুলাই ২০২৫ দুপুর, রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিনের মতো চলছে পাঠদান। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দগ্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকারে অভিভাবকসহ অন্যরা এগিয়ে এলেও আগুনের লেলিহান শিখায় পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। পরক্ষণেই জানা যায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ওই ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ শিক্ষার্থী, তিন শিক্ষক, তিন অভিভাবক, একজন আয়াসহ ৩৫ জন নিহত হন। বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮০ জন। জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় ৫৭ জনকে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে শোক, শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। নিহতদের স্মরণে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
এ সময় এক আলোচনাসভায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আমরা গভীর শোকের সঙ্গে নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’
ওই ঘটনার স্মরণে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে একটি কর্মসূচি থাকায় অনেক অভিভাবক সেখানে অংশ নিয়েছেন। বিকেলে অভিভাবকদের নিয়ে আরেকটি স্মরণসভা করা হয়।
মাইলস্টোন স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, স্মৃতিবেদির দুই পাশে নিহত ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত দুটি ব্যানার টাঙানো হয়। সেখানে নিহতদের সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনরা স্মৃতিচারণামূলক বিভিন্ন বার্তা লিখে শ্রদ্ধা জানান। দিবসটি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মোল্লা গণমাধ্যমকে জানান, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছিল। ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে শিশুদের আর্তচিৎকার শুনে তিনি তাদের উদ্ধারে ছুটে যান। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কিছুটা পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন। তারপরও ভবনের ফটকের কাছে এসে তিনি কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পান। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে তিনি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরীকে কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে দেখেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।
তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তার শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের পেছনের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাই।’
দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিমানের শব্দ এখনো তাদের আতঙ্কিত করে তোলে জানিয়ে শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমার সন্তান দীর্ঘদিন বিমানের শব্দ শুনে ঘুমাতে পারত না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনের উদ্যোগে ধীরে ধীরে সেই মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।’
স্কুলের শিক্ষক ফারজানা কাবেরী বলেন, নিহত শিশুরা তাদের কাছে নিজেদের সন্তানের মতোই ছিল। ওদের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছোট বাচ্চারা খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। দুর্ঘটনায় নিহত এক শিশুর স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সেদিন সকালে কোনো কারণ ছাড়াই সে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কিছু বলবে? সে শুধু বলেছিল এমনিই। পরে সেই শিশুই আর ফিরে আসেনি। বাচ্চারা বলছিল মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনের দেওয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’
দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কম হতো। কমিটির প্রধানের সুপারিশ ছিল, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।