গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী, কার্যকর, স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য সংস্কার ও গতিশীল করার তাগিদ ছিল, তার একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘রাজনৈতিক’ সিদ্ধান্তের বলি এই প্রতিষ্ঠান এখনো মুমূর্ষু অবস্থায় ‘লাইফ সাপার্টে’ রয়েছে। কমিশনের মানবাধিকার সংক্রান্ত কার্যক্রম গত ২১ মাস ধরে বন্ধ। দেশে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কিছু কাজ ছাড়া বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। এই অনিশ্চয়তা কবে কাটবে, তাও কেউ বলতে পারছেন না।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের যাত্রা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালের জুলাই মাসে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ করে। প্রতিষ্ঠার পর এই কমিশন সবচেয়ে বেশি সময় (১৫ বছর) ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তখন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনায় নিমজ্জিত ছিল কমিশন। আইনি সীমাবদ্ধতায় অনেকটা কাগুজে বাঘ হয়ে তাদের চলতে হয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা না থাকায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ এই সময়ে রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সরকার এসেছে, তারা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে একটি কার্যকর ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এখনো স্বপ্ন হয়েই আছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর মানবাধিকার কমিশনের তখনকার চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের মাধ্যমে কমিশন ভেঙে যায়। তখন কমিশনে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল ৫৪৮টি অভিযোগ। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর থেকে গত ১৪ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর কারওয়ানবাজারের মানবাধিকার কমিশনে প্রতিকারের জন্য অভিযোগ কিংবা আবেদন জমা পড়েছে ৮২৭টি। সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩৭৫ অভিযোগ এ মুহূর্তে জমা থাকলেও কমিশন কিছুই করতে পারছে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আসেন। তবে প্রতিকারের আশ্বাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন। সবার অভিযোগ নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু কমিশন পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কিছু করার নেই।’ আওয়ামী লীগ আমলের সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৭ নভেম্বর তিনি এবং কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এরপর দীর্ঘ সময় কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর গত বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করে তখনকার অন্তর্বতী সরকার। এতে আগের আইনে আমূল পরিবর্তন এনে প্রতিষ্ঠানটিকে যুগোপযোগী করার চেষ্টা করা হয়। অধ্যাদেশে কোনো সরকারি কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনীসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা পায় কমিশন। তদন্ত চলার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশে আইনানুগ ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণের সুযোগও রাখা হয়। পাশাপাশি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রহিত করা হয় অধ্যাদেশে। এমনকি আগের আইনে কমিশন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও অধ্যাদেশে প্রতিষ্ঠানটিকে অবমুক্ত করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় অধ্যাদেশের বিধান অনুযায়ী আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে বাছাই কমিটির মাধ্যমে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তার নেতৃত্বে কমিশনের নিয়োগপ্রাপ্ত আরও তিনজন কমিশনার গত ৫ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পেয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কমিশনকে বাস্তবে স্বাধীন করার পদক্ষেপের প্রশংসা করেন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে সেই উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যেতে দেরি হয়নি।
জাতীয় সংসদে গত ৯ এপ্রিল পাস হয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে আওয়ামী লীগের সময়কার আইনটি বহাল হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সে সময় জানান, অধ্যাদেশে অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি রয়েছে। তাই বিষয়টি অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।
অধ্যাদেশটি রহিতের কয়েক দিন পর কমিশনের চেয়ারপারসন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও অন্য তিন কমিশনার সরকারের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করেন। ফলে মাত্র দুই মাসের এই কমিশন কার্যত কোনো কাজ করতে পারেনি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ ও প্রকাশনা) ফারহানা সাঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের অধ্যাদেশ হওয়ার পর নতুন চেয়ারপারসন ও কমিশনাররা মাত্র দুই মাস কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এ সময়ে তারা কার্যক্রম গুছিয়ে আনছিলেন। তবে অধ্যাদেশটি বাতিলের পর তারা পদত্যাগ করেন। এখন কমিশনে শুধু রুটিন কিছু কাজ হচ্ছে।’
আইন মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া তৈরি করেছে। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গত ১৭ মে এ খসড়ার ওপর অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করে মন্ত্রণালয়। তবে খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন মহল। এমন অবস্থায় কবে, কীভাবে মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হবে, কমিশন কবে সচল হবে তার কোনো পরিষ্কার উত্তর কারও কাছে নেই। বিষয়টি নিয়ে জানতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। জাতীয় সংসদেও একটি বৈঠক হয়েছে। খসড়া পর্যালোচনা হচ্ছে। তবে নতুন আইন তৈরির বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেক্ষেত্রে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে।’
জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মানবাধিকার কমিশন আমাদের একটা অর্জন ছিল, কিন্তু কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠানটি দলীয়করণের বাইরে আছে, স্বাধীন আছে? সবগুলোই কোনো না কোনো দলের পকেটে ছিল। এখনো তাই আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই মানবাধিকার কমিশন থাকা, আর না থাকা একই কথা।’
‘বি’ স্ট্যাটাস থেকে ‘এ’ স্ট্যাটাস বহুদূর : মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও প্যারিস নীতিমালার শর্ত পূরণের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে পৃথিবীজুড়ে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (জিএএনএইচআরআই)’ ২০১৫ সালে ১১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘বি’ স্ট্যাটাস দেয়। ১১ বছর পরও এখনো সেই স্ট্যাটাস নিয়ে চলছে কমিশন। অথচ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মানবাধিকার কমিশন চলছে ‘এ’ স্ট্যাটাস নিয়ে। আর মিয়ানমার, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর কমিশনের রয়েছে ‘নো’ স্ট্যাটাস।
মানবাধিকারকর্মী ও কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা না থাকা, কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অন্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব, আর্থিক স্বাধীনতা না থাকার মতো কারণে বাংলাদেশের এই কমিশন ‘এ’ স্ট্যাটাসের ধারেকাছে যেতে পারেনি। আগামীতেও একই অবস্থা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
কমিশনের উপপরিচালক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবীর আর কোনো দেশে কোনো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এত দীর্ঘ সময় অকার্যকর রাখার নজির নেই। আমরা এখন মুমূর্ষ অবস্থায় আছি। ‘এ’ স্ট্যাটাস পাওয়ার চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। নতুন যে আইনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং সেটি ২০০৯ সালের আইনের মতোই। ফলে নিকট ভবিষ্যতে ‘এ’ স্ট্যাটাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।’