‘বাংলা কিউআর’ সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেনের পথে

বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে ‘বাংলা কিউআর’। দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য কাঠামোর আওতায় আনতে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য, দেশের প্রতিটি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একটি অভিন্ন কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা, যাতে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) হিসেব ব্যবহার করে সহজেই অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।

ঢাকার বড় বিপণিবিতান, চেইন সুপারশপ ও অভিজাত দোকানে বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে দেশের লেনদেনের বড় অংশ এখনো গ্রামীণ হাটবাজার, মুদি দোকান ও মফস্বলের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নগদনির্ভর। ফলে শহরের পাশাপাশি এসব এলাকায় বাংলা কিউআর কতটা কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে সাধারণ গ্রাহকের সক্ষমতা ও আস্থার ওপর। বাংলা কিউআর ব্যবহারের জন্য একজন গ্রাহকের প্রথমে মোবাইল ফোন থাকতে হবে। সেটি স্মার্টফোন হতে হবে এবং তাতে সচল ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে। অর্থাৎ, ডিজিটাল লেনদেনে অন্তর্ভুক্তির পথে তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাবে, ২০২৬ সালের মে নাগাদ দেশে মোট মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটি ৮৬ লাখ। তবে সংযোগের সংখ্যা প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে নিজের ফোন রয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশের। অর্থাৎ, একটি বড় অংশ এখনো পরিবারের অন্য সদস্যের ফোন ব্যবহার করেন। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি রয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার এখনো বেসিক ফোনের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো দিয়ে সরাসরি কিউআর কোড স্ক্যান করা সম্ভব নয়।

ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রেও দেশে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। বিটিআরসির হিসাবে, ২০২৬ সালের মে নাগাদ মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি ৯১ লাখ। মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড মিলিয়ে মোট ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ। তবে একাধিক সংযোগ ব্যবহারের কারণে প্রকৃত স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা এর চেয়ে কম হতে পারে।

শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল সক্ষমতার ব্যবধানও স্পষ্ট। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও শহরের ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের বিপরীতে গ্রামে এ হার ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সক্ষমতা কম। এই ব্যবধানকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে না দেখে শহর ও গ্রামের জন্য পৃথক নীতি ও কৌশল নেওয়া প্রয়োজন।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিজিটাল আর্থিক সেবা বিস্তারে বাংলাদেশ এরই মধ্যে সফলতা দেখিয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে ইউএসএসডি (*২৪৭#) প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ ফিচারের বেসিক ফোনেও লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এমএফএস হিসাবধারীদের মধ্যে গ্রাম ও শহরের অংশগ্রহণ প্রায় সমান; বরং গ্রামে অংশগ্রহণ সামান্য বেশি, প্রায় ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ।

তবে বাংলা কিউআর প্রযুক্তিগতভাবে ভিন্ন। কিউআর কোড স্ক্যান করতে স্মার্টফোন, ক্যামেরা ও সচল ইন্টারনেট প্রয়োজন। ফলে এমএফএসের মাধ্যমে তৈরি প্রথম ধাপের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা কিউআরকে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি গ্রাহকের আস্থাও বড় বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আর্থিক লেনদেনের ৫১ দশমিক ৮৮ শতাংশ এখনো নগদে সম্পন্ন হয়। নিরাপত্তা, প্রতারণার আশঙ্কা এবং ভুল লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা অনেক গ্রাহককে নগদ ব্যবহারে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে প্রবীণ ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে এই অনাস্থা তুলনামূলক বেশি। তাই আর্থিক সাক্ষরতা, জনসচেতনতা এবং দ্রুত প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, গত বছরের শেষ নাগাদ বাংলা কিউআরের আওতায় এসেছে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট। এ সময়ে প্রায় ৬৬ লাখ লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক ব্যবহারের ফলে লেনদেন আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ (এমডিআর) বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ১ জুলাই থেকে প্রতিটি বাংলা কিউআর লেনদেনে ব্যবসায়ীরা ন্যূনতম ১ শতাংশ এমডিআর দিতে হচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীদের জন্য এই ব্যয় সামান্য হলেও গ্রামীণ মুদি দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কম এমডিআর নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বাংলা কিউআরের বিস্তার দ্রুত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এমএফএসের মতো এজেন্টভিত্তিক মডেলে গ্রাহক ও দোকানিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন ও ডেটা প্যাকেজে সহায়তা দেওয়া এবং এমডিআরের খরচ গ্রাহকের ওপর চাপানো বন্ধে কঠোর নজরদারি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যাশব্যাক ও ছাড়ের মতো প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে।

স্মার্টফোননির্ভরতার বাইরে ইউএসএসডি-ভিত্তিক মার্চেন্ট কোড বা এসএমএসের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করার বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ফিচার ফোন ব্যবহারকারীরাও আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আসতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রতারণা বা ভুল লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা দৃশ্যমান করতে হবে।

বাংলা কিউআর বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আন্তঃপরিচালনযোগ্য কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার সময়োপযোগী উদ্যোগ। এর সাফল্য শুধু কত দোকানে কিউআর কোড প্রদর্শিত হচ্ছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শহর-গ্রামের কতজন মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত লেনদেন করতে পারছেন, তার ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তা, এমএফএস খাতের অভিজ্ঞতা এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

রাজু আহমেদ, সার্টিফায়েড ডিজিটাল ফাইন্যান্স প্র্যাকটিশনার ও

রাসেল হাসান, ব্যাংকার ও গবেষক